ইরানের কেশম দ্বীপে ‍যুক্তরাষ্ট্রের বারবার হামলার কারণ কি?

ইরানের বহুল আলোচিত কেশম দ্বীপে আবারও হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সোমবার (২ নভেম্বর) চালানো এ হামলাকে প্রতিরক্ষামূলক অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।

তেহরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন শুরুর পর বহুবার এই ছোট দ্বীপটি লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। কিন্তু ঠিক কি কারণে এই ভূখণ্ড মার্কিন সামরিক বাহিনীর চক্ষুশূল? কেনই বা এখানে একের পর এক হামলা চালায় তারা? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ভূগোলে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সোমবার প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দ্বীপটিতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ঠিক কি ধরণের হুমকিতে ছিল আমেরিকার সেনারা, তা নিশ্চি করে বলেনি।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই কেশম দ্বীপ যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। চলমান যুদ্ধের আগেও দ্বীপটিতে হামলা চালিয়েছিল মার্কিন বাহিনী। মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন বলছে, দ্বীপটির ভৌগোলিক অবস্থান, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে এর গুরুত্বের কারণে বারবার এটি হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, দ্বীপটিতে এ ধরনের হামলা এর আগেও গোপনে চালানো হয়েছিল। তবে সেসব হামলার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোরে শেষবার কেশম দ্বীপে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

কেন বারবার হামলার লক্ষ্য কেশম দ্বীপ?
এর প্রধান কারণ দ্বীপটির ভৌগোলিক অবস্থান। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত হরমুজ প্রণালির মুখে রয়েছে কেশম দ্বীপ। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করা হতো।

বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের বড় একটি অংশ এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। ফলে এখানে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ও দামে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।

কেশম দ্বীপে ইরানের একটি বড় ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা, নৌঘাঁটি এবং গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় সামরিক অবকাঠামো রয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। এসব স্থাপনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজের ওপর নজরদারি এবং সামরিক প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা রয়েছে ইরানের।

গত জুলাইয়েও কেশম দ্বীপে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) দাবি ছিল, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কমান্ড সেন্টার, ড্রোন স্থাপনা, উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা এবং সামুদ্রিক সামরিক সক্ষমতাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

ওই অভিযানে দ্বীপে তিনজন নিহত হওয়ার খবর দিয়েছিল ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। এ ছাড়া যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে দ্বীপটির আশপাশের সামরিক ও নৌ-অবকাঠামোও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।

হরমুজে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই
কেশম দ্বীপকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ঠেকানো। ইরান এই নৌপথকে নিজেদের কৌশলগত চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার ঘটনাগুলো নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক হামলাগুলো ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার সক্ষমতা কমানোর পাশাপাশি মার্কিন সামরিক সম্পদকে নিরাপদ রাখার উদ্দেশ্যে চালানো হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষকেরা জানিয়েছে, কেশম দ্বীপের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতে পারলে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নজরদারি ও সামরিক তৎপরতা ব্যাহত করা সম্ভব হতে পারে। তবে এ ধরনের হামলা সংঘাত আরও বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করছে।

কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেও হামলা
কেশম দ্বীপে নতুন হামলার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনা চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তেহরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও আলোচনায় অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন।

তবে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সতর্ক করে বলেছেন, সামরিক হুমকির কাছে ইরান আত্মসমর্পণ করবে না। নতুন করে বড় ধরনের হামলা হলে তার জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি।