যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো আগ্রাসন ঠেকাতে ইরানকে আরও শক্তিশালী করে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি। তিনি বলেছেন, শত্রুপক্ষকে কার্যকরভাবে প্রতিহত করার সক্ষমতা অর্জনের একমাত্র পথ হলো দেশের সার্বিক অগ্রগতি ও শক্তি বৃদ্ধি। একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন আবার শুরু হলে এবার আরও ব্যাপক পরিসরে জবাব দেবে তেহরান।
বুধবার (৪ নভেম্বর) ‘বিশ্ব আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জাতীয় দিবস’ উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় মোজতবা খামেনি বলেন, ইরানকে ক্রমাগত আরও শক্তিশালী করে তোলার কৌশল অব্যাহত রাখতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে জাতীয় ঐক্য, সংহতি ও সামাজিক সংহতি অপরিহার্য। দেশের জনগণ ও কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত এবং সম্মিলিত কর্মকাণ্ডে এসব নীতির প্রতিফলন ঘটাতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
পারস্য উপসাগর, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে খামেনি বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ যুক্তরাষ্ট্রের অজেয়তার ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। তাঁর দাবি, নিজ জনগণের পরিবর্তে বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরশীল সরকারগুলোর দুর্বলতা এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোকে রক্ষায় তাদের অক্ষমতাও প্রকাশ পেয়েছে।
খামেনির ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন ও অপরাধের জবাব হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং আঞ্চলিক দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছে। তিনি এসব পদক্ষেপকে আঞ্চলিক পর্যায়ে বিশ্ব আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক লড়াই হিসেবে বর্ণনা করেন। ভবিষ্যতে একই ধরনের আগ্রাসন আবার ঘটলে তার ব্যাপ্তি আরও অনেক বেশি হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আরও বলেন, ফিলিস্তিন ও লেবানন থেকে ইরাক ও ইয়েমেন পর্যন্ত প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোর কার্যক্রম এবং প্রতিরোধ ফ্রন্টের ঐক্য নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি করছে। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ও আন্তর্জাতিক প্রভাব, দুই ক্ষেত্রেই পতন ঘটছে এবং দেশটির আধিপত্যের অবক্ষয় ত্বরান্বিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে কিংবা দেশটির রাজনৈতিক ও দলীয় পরিবর্তনের ফলে ইরানের প্রতি নীতিতে বদল ঘটবে, এমন প্রত্যাশার বিরুদ্ধেও সতর্ক করেন মোজতবা খামেনি। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা বা ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে দেশটির বৈরিতা থামানো যাবে বলে যাঁরা মনে করেন, তাঁরা গুরুতর ভুল করছেন। তিনি বলেন, ইরানের কাছ থেকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ আদায় করাই যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বৈরিতার প্রসঙ্গ টেনে খামেনি ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর অভিযোগ, ওই অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল ইরানের জাতীয় সম্পদ, বিশেষ করে তেলসম্পদের ওপর লুণ্ঠন অব্যাহত রাখা। পরবর্তী দশকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সম্পদ লুটের চেষ্টা করেছে এবং তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীকে বিরোধী আন্দোলন দমনে সহায়তা দিতে সাভাক নিরাপত্তা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
ইসলামি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ও অভ্যুত্থানকারীদের সমর্থন, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন সরকারের পাশে দাঁড়ানো, ইরানের বেসামরিক বিমান ধ্বংস, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার অভিযোগও তোলেন খামেনি। তাঁর দাবি, বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলায় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি, বিজ্ঞানী, সামরিক কমান্ডার ও সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন।
এসব চাপ ও আগ্রাসনের মধ্যেও ইরান প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে বলে দাবি করেন মোজতবা খামেনি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা প্রতিবারই ইরানি জনগণের দৃঢ় সংকল্পের মুখে বাধার সম্মুখীন হয়েছে। তাঁর মতে, আঞ্চলিক ঘটনাপ্রবাহ এবং প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোর কার্যক্রম আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বার্তায় দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপরও গুরুত্ব দেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা। তিনি বলেন, জনগণের জীবনযাত্রা, স্বাচ্ছন্দ্য ও মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক কল্যাণে কাজ করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। একই সঙ্গে তরুণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও স্কুলপড়ুয়াদের দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা, দৃঢ় সংকল্প ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে হতাশা কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান খামেনি।
শেষে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ইরানি জনগণ শিগগিরই বিজয়, সমৃদ্ধি ও সার্বিক অগ্রগতি অর্জন করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের পতন আরও ত্বরান্বিত হবে। সূত্র: প্রেস টিভি