ইরানের টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো, ইন্টারনেট ফিল্টারিং ও নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত এক জটিল করপোরেট নেটওয়ার্কের সন্ধান পেয়েছে অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল। হাজার হাজার পৃষ্ঠার আর্থিক বিবরণী, কোম্পানি নিবন্ধন নথি ও অন্যান্য দলিল বিশ্লেষণ করে ৬৯০ ব্যক্তি এবং ২৯৮টি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা শনাক্ত করেছে সংবাদমাধ্যমটি।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আনুষ্ঠানিক মালিকানা কাঠামোয় পরিবর্তন এলেও ইরানের টেলিযোগাযোগ খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায়িক সম্পর্কের মধ্যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির প্রভাবের যোগসূত্র রয়ে গেছে।
ইরানের ইন্টারনেট অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসা, বেসরকারি ঠিকাদার এবং বিদেশি প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের নিয়ে গড়ে উঠেছে বিস্তৃত একটি নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশটির সরকার ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত করা, ওয়েবসাইট ও সেবা বন্ধ রাখা এবং আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপের সক্ষমতা ধরে রেখেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে জটিল। একাধিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে একই ব্যক্তিদের উপস্থিতি, অভিন্ন ঠিকানা, পারস্পরিক শেয়ার ধারণ এবং কোম্পানি পুনর্গঠনের মাধ্যমে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণকারী মালিককে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে টেলিযোগাযোগ কোম্পানির ভূমিকা
ইরানে ইন্টারনেট বন্ধ বা সীমিত করার নির্দেশ আসে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। তবে সেই নির্দেশ কার্যকর করতে হয় দেশটির স্থির ও মোবাইল নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। ফলে টেলিযোগাযোগ কোম্পানিগুলো সরকারের ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের ১৮ জানুয়ারির একটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর ইন্টারনেট বন্ধের সময় ইরানসেলের প্রধান নির্বাহীকে বরখাস্ত করা হয়। আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট বার্তা সংস্থা ফার্স জানিয়েছিল, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করায় তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনা ইঙ্গিত দেয়, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে টেলিযোগাযোগ অপারেটরদের ওপর নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
টেলিকম কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে আইআরজিসির পুরোনো যোগসূত্র
ইরানের প্রধান স্থির টেলিফোন অপারেটর টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি অব ইরান বা টিসিআই। দেশটির বৃহত্তম মোবাইল অপারেটর হামরাহ-এ-আভালেরও সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের হাতে।
২০০৯ সালে আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং ইমাম খোমেনির আদেশ বাস্তবায়নকারী সংস্থা—এক্সিকিউশন অব ইমাম খোমেনিস অর্ডার বা সেটাদ-সংশ্লিষ্ট একটি কনসোর্টিয়াম টিসিআই অধিগ্রহণ করে। কনসোর্টিয়ামটির নাম তোসেয়ে এতেমাদ মোবিন।
২০১৮ সালে আইআরজিসি ঘোষণা দিয়েছিল, তাদের সমবায় ফাউন্ডেশন টিসিআইয়ের শেয়ার মালিকানা থেকে সরে দাঁড়াবে। এর আগে তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সামরিক বাহিনীকে সামরিক দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কহীন ব্যবসা থেকে সরে আসার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
কিন্তু ইরান ইন্টারন্যাশনালের অনুসন্ধানে পরবর্তী সময়ের কোম্পানি নিবন্ধন ও আর্থিক নথিতে দেখা গেছে, তোসেয়ে এতেমাদ মোবিনের উল্লেখযোগ্য শেয়ারধারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা ও ব্যবসায়িক সম্পর্কের সঙ্গে আইআরজিসির সমবায় ফাউন্ডেশনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যুক্ত রয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তামিন এতেমাদ জাগরোস ও এতেমাদ মেহর পার্স গ্রুপ—এই দুটি প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে তোসেয়ে এতেমাদ মোবিনের প্রায় ৫২ শতাংশ শেয়ার ধারণ করেছিল। এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের সঙ্গে আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কোম্পানির ব্যক্তিদের যোগাযোগ পাওয়া গেছে।
তেহরানের সাদাত আবাদ এলাকার ৪৭ নম্বর ইস্ট ১৮তম স্ট্রিটের একই ঠিকানায় একাধিক কোম্পানির নিবন্ধন, একই দিনে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক নিবন্ধন নম্বর এবং একই ব্যাংক শাখা থেকে মূলধন জমার সনদ নেওয়ার তথ্যও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
ইরান ইন্টারন্যাশনালের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এসব কোম্পানির পরিচালকদের অনেকে বিভিন্ন সময়ে আইআরজিসির সমবায় ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে এসব সম্পর্কের ভিত্তিতে প্রতিটি কোম্পানির বর্তমান প্রকৃত মালিকানা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না বলেও প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
ইরানসেলের শেয়ার হস্তান্তর, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ১৩ দিন পর
অনুসন্ধানে ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল অপারেটর ইরানসেলের মালিকানা পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানসেলের সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারধারী ছিল গোস্তারেশে ইলেকট্রনিক ইরান। প্রতিষ্ঠানটি মোস্তাজাফান ফাউন্ডেশন এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন ইরান ইলেকট্রনিকস ইন্ডাস্ট্রিজ বা সাইরানের যৌথ উদ্যোগ।
২০২০ সালের ১৮ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্র গোস্তারেশে ইলেকট্রনিক ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর মাত্র ১৩ দিন পর, ১ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটির ইরানসেলের শেয়ার কওসার সায়ান পানিজ নামে আরেকটি কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ইরান ইন্টারন্যাশনালের হাতে পাওয়া আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, শেয়ার হস্তান্তর হয়েছিল হিসাবমূল্যে এবং অর্থ পরিশোধের সময়সীমা পরে নির্ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছিল।
অনুসন্ধানে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামরিক সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের ব্যক্তিদের যোগাযোগও পাওয়া গেছে। শেয়ার হস্তান্তরের দিন মোস্তফা জারভান্দি কওসারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন। এর আগে তিনি আইআরজিসির সমবায় ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি হিসেবে একটি খনি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
এ ছাড়া কওসারের চেয়ারম্যান আগে সাইরানের টেলিযোগাযোগ শিল্প বিভাগের অর্থবিষয়ক উপপ্রধান ছিলেন। ২০২২ সাল থেকে বিক্রেতা গোস্তারেশে ইলেকট্রনিক ইরান এবং ক্রেতা কওসার সায়ান পানিজ—দুই প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মোহাম্মদ আজারহুশ পিরপোশতেহ।
তবে এই লেনদেন নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল কি না কিংবা কওসার সায়ান পানিজের প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিক কারা—তা অনুসন্ধানে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি বলে ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে।
চীনা প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়ছে
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অর্থ লেনদেনের সীমাবদ্ধতার কারণে ইরানের টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোয় চীনা প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের গুরুত্ব বেড়েছে।
ইরান ইন্টারন্যাশনালের বিশ্লেষণ করা আর্থিক নথিতে দেখা গেছে, হামরাহ-এ-আভালের পুরোনো নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্পে নকিয়া ও এরিকসনের কাছে উল্লেখযোগ্য দায় রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি হুয়াওয়ের কাছ থেকে যন্ত্রপাতি কেনা ও অগ্রিম অর্থ পরিশোধ অব্যাহত রেখেছে।
টিসিআই ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করে ফারা তামিন এরতেবাতাত পায়দার নামের একটি কোম্পানি। আগে প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল দারিয়া সাহেল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই কোম্পানির আর্থিক বিবরণীতে টিসিআইয়ের নিশ্চয়তায় হুয়াওয়ের যন্ত্রপাতি কেনার তথ্য রয়েছে। তাদের মজুত তালিকায় হুয়াওয়ের মডেম, ফাইবার-অপটিক টার্মিনাল এবং চীনা প্রতিষ্ঠান ফাইবারহোমের তৈরি যন্ত্রপাতিও পাওয়া গেছে।
এসব যন্ত্রপাতির কিছু অংশে দূর থেকে নেটওয়ার্ক পরিচালনা, সেটিং পরিবর্তন, সফটওয়্যার হালনাগাদ এবং যন্ত্রপাতির অবস্থা পর্যবেক্ষণের সুবিধা রয়েছে। তবে আধুনিক টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কে এ ধরনের প্রযুক্তি প্রচলিত। শুধু এই প্রযুক্তির উপস্থিতি থেকে নজরদারি বা সেন্সরশিপে এর ব্যবহার প্রমাণিত হয় না বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইন্টারনেট ফিল্টারিংয়ে বেসরকারি ঠিকাদার
ইরানের ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শুধু টেলিযোগাযোগ অপারেটরদের ওপর নির্ভরশীল নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ফিল্টারিং প্রযুক্তি ও নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণ সেবা দেওয়া বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দোরান ডেটা প্রসেসিং। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানি টেলিযোগাযোগ অপারেটর ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ফিল্টারিং এবং নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণ প্রকল্পে কাজ করেছে। ইন্টারনেট সেন্সরশিপে ভূমিকার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠানটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
এ ছাড়া ইয়াফতার নামে পরিচিত ইয়াফতার পাজুহান পিশতাজ রায়ানেশ নামের আরেকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি ইন্টারনেট ফিল্টারিং ও নজরদারি প্রযুক্তিতে ভূমিকার অভিযোগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবাধিকার নিষেধাজ্ঞার তালিকায় প্রতিষ্ঠানটির নাম যুক্ত হয়।
অনুসন্ধানে আরও বলা হয়েছে, ইরানের জাতীয় তথ্য নেটওয়ার্ক বা ন্যাশনাল ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজেও বিভিন্ন কোম্পানি যুক্ত। এই অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কের কারণে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত বা বন্ধ থাকলেও দেশটির ব্যাংকিং ও সরকারি সেবার মতো কিছু অভ্যন্তরীণ পরিষেবা চালু রাখা সম্ভব হয়।
ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের শীর্ষে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামো
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা মূলত দুটি ধারায় পরিচালিত হয়। প্রথমটি হলো টেলিযোগাযোগ অপারেটরগুলোর মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো। দ্বিতীয়টি হলো আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগের প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ।
টেলিকমিউনিকেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার কোম্পানি দেশটির আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। প্রতিষ্ঠানটি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন।
অন্যদিকে টিসিআই, হামরাহ-এ-আভাল, ইরানসেল ও রাইটেল—এই স্থির ও মোবাইল অপারেটরগুলো সাধারণ গ্রাহকদের ইন্টারনেট সংযোগ দেয়। এসব প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকায় ওয়েবসাইট বন্ধ, সংযোগের গতি কমানো কিংবা গ্রাহকের ইন্টারনেট ব্যবহার বিচ্ছিন্ন করার মতো পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
ইরানের তৃতীয় বৃহত্তম মোবাইল অপারেটর রাইটেলের মালিকানা অবশ্য ভিন্ন। এটি সামাজিক নিরাপত্তা সংস্থার অধীন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানায় রয়েছে। অনুসন্ধানে রাইটেলের মালিকানায় আইআরজিসি বা সেটাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন সাইরানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এর ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে।
সাইবার নীতিনির্ধারণে সর্বোচ্চ সাইবার কাউন্সিল
ইরানে ইন্টারনেট নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান সুপ্রিম কাউন্সিল অব সাইবারস্পেস। ২০১২ সালের মার্চে তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির নির্দেশে এই কাউন্সিল প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশটির সাইবার কার্যক্রমের নীতিনির্ধারণ, সমন্বয় ও তদারকি কেন্দ্রীভূত করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাউন্সিলে ১৭টি প্রাতিষ্ঠানিক ও ১০টি ব্যক্তিগত সদস্যপদ রয়েছে। ব্যক্তিগত সদস্যদের নিয়োগ দেন সর্বোচ্চ নেতা। আইআরজিসি ও গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়সহ নিরাপত্তা সংস্থাগুলোও এই কাঠামোর অংশ।
ফলে ইরানে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত শুধু যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের একক এখতিয়ার নয়। বরং সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে তা নির্ধারিত হয়।
মালিকানা বদলালেও সম্পর্কের ধারাবাহিকতা
ইরান ইন্টারন্যাশনালের অনুসন্ধানের মূল পর্যবেক্ষণ হলো, ইরানের টেলিযোগাযোগ খাতে আনুষ্ঠানিক মালিকানা পরিবর্তন হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায়িক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।
কোম্পানির শেয়ার অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর, পরস্পর-সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মাধ্যমে মালিকানা কাঠামো তৈরি এবং একই ব্যক্তিদের একাধিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে নিয়োগ—এসব কারণে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণকারী মালিক শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে অনুসন্ধানটি এমন দাবি করেনি যে চিহ্নিত ৬৯০ ব্যক্তি বা ২৯৮টি প্রতিষ্ঠানের সবাই সরাসরি ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন কিংবা বাস্তবায়নে অংশ নিয়েছেন। বরং নথিপত্রে পাওয়া মালিকানা, ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ ও চুক্তিভিত্তিক সম্পর্কের একটি বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
ইরানের ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের কাঠামো তাই কেবল একটি সরকারি নির্দেশ বা একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল নয়। এর পেছনে রয়েছে সামরিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক, টেলিযোগাযোগ অপারেটর, প্রযুক্তি সরবরাহকারী এবং ফিল্টারিং সেবাদাতা কোম্পানির বহুস্তরীয় ব্যবস্থা। এই জটিল কাঠামোই দেশটির কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনের সময় আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট থেকে নাগরিকদের বিচ্ছিন্ন করার সক্ষমতা দেয় বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।