আইজেনকোটকে নিয়ে ইরান যা ভাবছে

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিদায়ের সম্ভাবনা এবং গাদি আইজেনকোটের সরকার গঠনের উদ্যোগকে ঘিরে তেহরানে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে ইরানের সরকারি অবস্থান ও দেশটির সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—নেতানিয়াহুর পরিবর্তে আইজেনকোট প্রধানমন্ত্রী হলেও ইরানের প্রতি ইসরায়েলের মৌলিক নিরাপত্তা ও সামরিক নীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে, এমন প্রত্যাশা করছে না তেহরান।

ইরানের বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করে, দুই নেতার মধ্যে পার্থক্য মূলত যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের পদ্ধতিতে। অর্থাৎ, নেতানিয়াহুর পরিবর্তে আইজেনকোট এলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হবে না; বরং সংঘাতের সময়, পরিসর ও ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। 

প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: আইজেনকোট এখনো ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হননি। ৭ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ তাঁকে নতুন সরকার গঠনের প্রথম সুযোগ দিয়েছেন। সরকার গঠনের জন্য তাঁর হাতে ২৮ দিন, প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। ফলে তাঁকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী বলা যায়, নিশ্চিত প্রধানমন্ত্রী নয়। 

ইরানের সরকারি অবস্থান: কে প্রধানমন্ত্রী, তাতে বড় পার্থক্য নেই

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ইসরায়েলের নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, দেশটির প্রধানমন্ত্রী কে হলেন, তা নিয়ে তেহরানের বিশেষ আগ্রহ নেই। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, ইরানের দৃষ্টিতে ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেও দেশটির প্রতি শত্রুতামূলক অবস্থানের অবসান হবে না।

ইরানের সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের আলোচনাতেও একই ধরনের মনোভাব দেখা গেছে। ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত ইরান ইন্টারন্যাশনাল-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা নির্বাচনের ফল নিয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও দেশটির সংবাদমাধ্যমে নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটের মধ্যে ইরানবিষয়ক নীতির মৌলিক পার্থক্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে।

তেহরানের নূর নিউজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক মাসউদ আসাদোল্লাহি বলেছেন, শুধু প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের কারণে ইরান-ইসরায়েলের পারস্পরিক হুমকি বা কৌশলগত বিরোধ দূর হয়ে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তাঁর মতে, নেতানিয়াহুর বিরোধীরা ইরানকে মোকাবিলার মৌলিক লক্ষ্য থেকে সরে আসার চেয়ে যুদ্ধ পরিচালনা ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিতে ভিন্নতা আনতে পারেন।

আইজেনকোটের ইরাননীতি: সংঘাতের লক্ষ্য থেকে সরে আসার ইঙ্গিত নেই

আইজেনকোটের অতীত বক্তব্যও তেহরানের উদ্বেগের কারণ। ১৯ অক্টোবর আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পরও আইজেনকোট সংঘাতকে অসমাপ্ত বলে বর্ণনা করেছেন।

নিজের দল ইয়াশারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস বা পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করাই শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেই লক্ষ্য তখনো অর্জিত হয়নি।

আলজাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়, ইসরায়েলের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ইরানের শাসনব্যবস্থার প্রতি বিরোধিতার প্রশ্নে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে। বিরোধী নেতারাও ইরানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে নতুন সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা নাকচ করেননি। তাঁদের আপত্তির বড় অংশ ছিল নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য সামরিক উত্তেজনা তৈরির উদ্যোগ নিয়ে।

অর্থাৎ, আইজেনকোট নেতানিয়াহুর যুদ্ধ পরিচালনার সমালোচনা করলেও ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান নরম—এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না।

তেহরানের বিশ্লেষণ: নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটের পার্থক্য কোথায়?

ইরানের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণে দুই নেতার মধ্যে কয়েকটি পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে।

১. যুদ্ধের কৌশল ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ: নেতানিয়াহু সামরিক সংঘাতকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে আগ্রহী বলে ইরানি বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করে। আইজেনকোটের ক্ষেত্রে সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

২. যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয়: ইরানের বিশ্লেষকদের ধারণা, আইজেনকোট যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রেখে ইরানকে মোকাবিলার চেষ্টা করতে পারেন। তবে ওয়াশিংটনকে নতুন করে যুদ্ধে জড়ানোর জন্য নেতানিয়াহুর মতো চাপ সৃষ্টি করবেন কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন।

৩. সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি: আইজেনকোট ক্ষমতায় এলে তাৎক্ষণিক সংঘাতের ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে—এমন ধারণা রয়েছে। কিন্তু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে বড় ধরনের অগ্রগতি দেখা গেলে তাঁর সরকারও সামরিক পদক্ষেপের পথ বেছে নিতে পারে।

ইরান ইন্টারন্যাশনাল ও আমওয়াজ মিডিয়া-র বিশ্লেষণে এসব মতপার্থক্য উঠে এসেছে। তবে এগুলো ইরানের সব রাজনৈতিক পক্ষের অভিন্ন অবস্থান নয়।

আইজেনকোটের সরকার হলে যুদ্ধের ঝুঁকি কমবে?

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সুফান সেন্টারের ২ নভেম্বর প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আইজেনকোট সরকার গঠন করলে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক সংঘাতে উৎসাহিত করার সম্ভাবনা নেতানিয়াহুর তুলনায় কম হতে পারে। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে আইজেনকোটের সরকারও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া কিংবা এককভাবে হামলা চালানোর পথ বন্ধ করে দেবে না।

সেন্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আইজেনকোট গাজা ও লেবানন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন উদ্যোগের সঙ্গে সহযোগিতার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থের প্রশ্নে তাঁর সরকারও কঠোর অবস্থান বজায় রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে, ইসরায়েলে সরকার গঠনের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে অন্তর্বর্তী পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। ইরানের কয়েকজন বিশ্লেষকের আশঙ্কা, এ সময় নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার সামরিক পদক্ষেপের সুযোগ নিতে পারে। ফলে নতুন সরকার গঠনের আগের সময়টিও তেহরানের কাছে উদ্বেগের বিষয়।

তেহরানের জন্য সম্ভাব্য হিসাব

ইরানের দৃষ্টিতে আইজেনকোটের উত্থানে কিছু কৌশলগত সুযোগ তৈরি হতে পারে। নেতানিয়াহুর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং ইরানবিষয়ক নীতিতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলে তেহরান কূটনৈতিকভাবে সেই পরিস্থিতি কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে।

তবে আইজেনকোটের সরকার গঠনের সম্ভাবনা মানেই ইরানের ওপর সামরিক চাপ কমে যাওয়া নয়। ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও দেশটির সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামো, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়গুলো বহাল থাকবে।

সুতরাং, তেহরানের কাছে নেতানিয়াহুর বিদায় হয়তো একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন; কিন্তু ইরানবিরোধী ইসরায়েলি কৌশলের অবসান নয়। আইজেনকোট প্রধানমন্ত্রী হলে যুদ্ধের ভাষা, কূটনৈতিক সমন্বয় এবং সামরিক পদক্ষেপের সময়সূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক বিকল্প পুরোপুরি বাদ পড়বে—এমন ধারণার পক্ষে এখনো যথেষ্ট ভিত্তি নেই।

উপসংহার: ইরানের দৃষ্টিতে নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটের মধ্যে মূল পার্থক্য ‘যুদ্ধ হবে কি হবে না’—এ প্রশ্নে নয়; বরং ইরানকে মোকাবিলায় কে কীভাবে, কখন এবং কতটা আন্তর্জাতিক সমর্থন নিয়ে পদক্ষেপ নেবেন, সেই কৌশলে।