ক্ষেপণাস্ত্র প্রশ্নে অনড় ইরান, পুনরায় আলোচনার প্রস্তাব 

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করলেও সে বিষয়ে স্পষ্ট লাল দাগ টেনে দিয়েছে ইরান। তেহরানের ভাষ্য, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কোনোভাবেই আলোচনার টেবিলে আসবে না। একইসঙ্গে ইরানের ভূখণ্ডে হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোই লক্ষ্যবস্তু হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে। আলোচনার আড়ালে চলা চাপ, নিষেধাজ্ঞা আর সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের মধ্যেই এগোচ্ছে এই কূটনৈতিক টানাপোড়েন। খবর আল জাজিরা

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শিগগিরই আবার শুরু হবে বলে তিনি আশা করছেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওমানে মধ্যস্থতামূলক আলোচনার পর আগামী সপ্তাহে আরেক দফা বৈঠকের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। 

শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) আল জাজিরাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আরাগচি বলেন, শুক্রবারের আলোচনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ‘কখনোই আলোচনার বিষয় ছিল না’। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

তিনি জানান, মাসকাটে হওয়া আলোচনা পরোক্ষ হলেও ‘আমেরিকান প্রতিনিধিদলের সঙ্গে করমর্দনের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল’। তার মতে, এই আলোচনা ‘ভালো একটি সূচনা’ ছিল, তবে আস্থা গড়ে তুলতে ‘এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে’।

তবে ইরানের রাজধানী তেহরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই আলোচনা নিয়ে তেমন আশাবাদ দেখা যায়নি। নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নারী আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমার মনে হয় আগেরবারগুলোর মতোই এই আলোচনা কোনো ফল ছাড়াই শেষ হবে। দুই পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে অনড় এবং পিছু হটতে রাজি নয়।’

কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ আবদুল্লাহ আল-শায়জি বলেন, তিনি নতুন কোনও সমঝোতার আশা করলেও খুব বেশি আশাবাদী নন।

কাতারের দোহায় আল জাজিরা ফোরাম থেকে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান খুবই কঠোর এবং ইসরায়েলের প্ররোচনায় তারা ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে চায়। তাদের ধারণা, ইরান এখন সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে, বিশেষ করে গত মাসের সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর, তাই সহজেই ছাড় আদায় করা যাবে।

এর আগে শুক্রবারের আলোচনাকে ‘খুব ভালো’ বললেও শনিবার থেকে কার্যকর একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প। ওই আদেশে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের কথা বলা হয়। এছাড়া ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত করতে একাধিক শিপিং প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণাও দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরানের মোট বাণিজ্যের এক-চতুর্থাংশের বেশি ছিল চীনের সঙ্গে। ওই বছরে চীন থেকে ইরানের আমদানি ছিল ১৮ বিলিয়ন ডলার এবং রপ্তানি ছিল ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।

আরাগচি বলেন, পারমাণবিক জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ ইরানের ‘অপরিবর্তনীয় অধিকার’ এবং তা অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, ‘সমৃদ্ধকরণ নিয়ে আমরা আশ্বস্তকারী একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে প্রস্তুত। ইরানের পারমাণবিক ইস্যুর সমাধান কেবল আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব।’

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেই, কারণ এটি সরাসরি ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা’র সঙ্গে সম্পর্কিত।

অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসন ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনের বিষয়গুলো আলোচনায় আনতে চায়। এছাড়া এই বিষয়ে ইসরায়েলও আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করার জন্য চাপ দিচ্ছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হয়েছে। তেহরান বারবারই পারমাণবিক ইস্যুর বাইরে আলোচনার পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এসেছে।

আল-শায়জি বলেন, ‘ইরান কোনও ধরনের ছাড় দিতে একেবারেই রাজি নয়, যেমনটি যুক্তরাষ্ট্রও নয়। ফলে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর জন্য দুই পক্ষকে কাছাকাছি আনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে।’

গত বছর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমাণবিক আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর এটিই ছিল প্রথম বৈঠক। তখন ইসরায়েলের নজিরবিহীন বোমা হামলার জেরে ১২ দিনের যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। এরপর গত মাসে ইরানে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পর ট্রাম্প দেশটির বিরুদ্ধে হুমকি আরও জোরদার করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করেন।

এদিকে ওমানে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিনিধি বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার শনিবার আরব সাগরে অবস্থানরত ওই বিমানবাহী রণতরী পরিদর্শন করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে উইটকফ বলেন, এই রণতরী ও এর স্ট্রাইক গ্রুপ ‘আমাদের নিরাপদ রাখছে এবং শক্তির মাধ্যমে শান্তির বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বার্তা বাস্তবায়ন করছে।’

তিনি জানান, মঙ্গলবার ‘স্পষ্ট উদ্দেশ্য ছাড়া’ রণতরীর কাছে আসা একটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করা পাইলটের সঙ্গেও তিনি কথা বলেছেন। উইটকফ লেখেন, ‘যারা আমাদের স্বার্থ রক্ষা করে, প্রতিপক্ষকে নিরুৎসাহিত করে এবং প্রতিদিন দায়িত্বে থেকে বিশ্বের সামনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতি ও দৃঢ়তার উদাহরণ তুলে ধরে— তাদের পাশে থাকতে পেরে আমি গর্বিত।’

ট্রাম্প এই রণতরী মোতায়েনকে ইরানের ওপর চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইলেও আল-শায়জি বলেন, এটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হতে পারে না। তার ভাষ্য, ‘তিনি দীর্ঘদিন সেনাদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখতে পারবেন না। এতে ইরান ইস্যুতে অতিমাত্রায় কঠোর অবস্থানের কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

এদিকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ইরান নিয়ে আলোচনার বিষয়ে কথা বলতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বুধবার ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বিবৃতিতে বলা হয়, নেতানিয়াহু মনে করেন, যেকোনও আলোচনায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সীমাবদ্ধতা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত।

গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালিয়েছিল। আরাগচি আশা প্রকাশ করে বলেন, ওয়াশিংটন যেন ‘হুমকি ও চাপ’ দেয়া থেকে বিরত থাকে, যাতে আলোচনা এগিয়ে নেয়া সম্ভব হয়।