ইরানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত যুদ্ধের প্রতিবাদে এবং মার্কিন প্রশাসনের নীতিগত অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করে পদত্যাগ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রভাবশালী গোয়েন্দা কর্মকর্তা জো কেন্ট। পদত্যাগের আগে তিনি ন্যাশনাল কাউন্টার-টেররিজম সেন্টারের (NCTC) পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন।
মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে নিজের পদত্যাগপত্র প্রকাশ করে তিনি ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে তোলপাড় সৃষ্টি করেছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে লেখা চিঠিতে জো কেন্ট সাফ জানিয়েছেন, তিনি বিবেকের তাড়নায় এই ‘অন্যায্য’ যুদ্ধকে সমর্থন করতে পারছেন না। তিনি লিখেন, ‘আমি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে পদত্যাগ করছি। ইরান আমাদের দেশের জন্য কোনো আসন্ন হুমকি ছিল না। এটি স্পষ্ট যে, আমরা কেবল ইসরায়েল এবং তাদের শক্তিশালী আমেরিকান লবির চাপেই এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ শুরু করেছি।’
১১ বার সম্মুখ সমরে অংশ নেওয়া এই যুদ্ধ-বিশারদ তার চিঠিতে ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের উদাহরণ টেনে এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ‘ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ এবং মার্কিন সংবাদমাধ্যমের একাংশ পরিকল্পিতভাবে আপনার (ট্রাম্প) কাছে ভুল তথ্য সরবরাহ করেছে। তাদের লক্ষ্য ছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে ধূলিসাৎ করে আপনাকে যুদ্ধে নামানো। ঠিক এই একই কৌশলে আমাদের একসময় ইরাক যুদ্ধের চোরাবালিতে টেনে নেওয়া হয়েছিল, যার ফলে আমাদের হাজার হাজার দেশপ্রেমিক প্রাণ হারিয়েছিলেন। আমরা সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে পারি না।’
জো কেন্টের এই প্রতিবাদের পেছনে রয়েছে এক হৃদয়বিদারক পারিবারিক ইতিহাস। তার প্রথম স্ত্রী শ্যানন কেন্ট, যিনি মার্কিন নৌবাহিনীর একজন দক্ষ গোয়েন্দা কর্মী ছিলেন, ২০১৯ সালে সিরিয়ায় এক আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন। কেন্ট তার চিঠিতে স্ত্রীকে হারানোর সেই ক্ষত স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আমি একজন ‘গোল্ড স্টার’ স্বামী। ইসরায়েলের তৈরি করা একটি অর্থহীন যুদ্ধে আমি আমার স্ত্রীকে হারিয়েছি। আমি আর চাই না মার্কিন নাগরিকদের রক্ত দিয়ে অন্য দেশের স্বার্থ রক্ষা করা হোক।’
জো কেন্টের পদত্যাগ ও অভিযোগের পর ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি কেন্টের মূল্যায়নকে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলেন, ‘আমি সবসময় জানতাম সে ভালো লোক, কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সে অত্যন্ত দুর্বল। সে বলছে ইরান নাকি আমাদের জন্য হুমকি নয়! এমন চিন্তা যার মাথায় থাকে, তার এই প্রশাসন থেকে বিদায় নেওয়াটাই দেশের জন্য মঙ্গলের।’ হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকেও কেন্টের অভিযোগগুলোকে ‘অপমানজনক ও হাস্যকর’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
জো কেন্টের এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান শিবিরের ভেতরেও ফাটল ধরিয়েছে। প্রভাবশালী সংবাদিক ও উপস্থাপক টাকার কার্লসন কেন্টের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন। অন্যদিকে, অনেক রিপাবলিকান নেতা তাকে ‘অবিশ্বস্ত’ এবং তার বক্তব্যকে ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ (Anti-Semitic) বলে আখ্যা দিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জো কেন্ট কেবল একজন কর্মকর্তা নন, তিনি ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকদের (MAGA base) কাছে একজন হিরো। তার এই বিদ্রোহ আগামী নির্বাচনে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় বড় ধরণের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যারা বৈদেশিক যুদ্ধে মার্কিন সেনা পাঠানোর বিরোধী, কেন্টের এই চিঠি তাদের জন্য একটি বড় অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।