ইউরোপের ইতিহাসের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রতিরক্ষা কর্মসূচিটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। শিল্পখাতের অভ্যন্তরীণ তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার কাছে নতি স্বীকার করে জার্মানি ও ফ্রান্সের নেতারা নতুন প্রজন্মের একটি যুগান্তকারী যৌথ যুদ্ধবিমান তৈরি ও নির্মাণের প্রকল্প বাতিল করতে সম্মত হয়েছেন।
সোমবার (৮ জুন) সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
শীর্ষ বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
জার্মান কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, গত সপ্তাহে মন্টেনিগ্রোতে অনুষ্ঠিত ইইউ-পশ্চিম বলকান শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এই সমস্যা জর্জরিত প্রকল্পটি নিয়ে একান্ত আলোচনায় বসেন। কয়েক মাসের নিবিড় চেষ্টার পরও এই পরিকল্পনার সাথে জড়িত শীর্ষস্থানীয় অস্ত্র সংস্থাগুলোর মধ্যকার অচলাবস্থা ভাঙার কোনো সম্ভাবনা না থাকায়, তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন। চ্যান্সেলর মের্জ ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁকে যৌথ যুদ্ধবিমান নির্মাণের কাজটি আর এগিয়ে না নিয়ে যাওয়ার স্পষ্ট পরামর্শ দেন।
ম্যাক্রোঁর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, দুই নেতা প্রকল্পটি নিয়ে দীর্ঘ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করেছেন। তবে এর প্রধান দুই শিল্প অংশীদার—জার্মানি ও স্পেনের প্রতিনিধিত্বকারী ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা 'এয়ারবাস' এবং ফ্রান্সের 'দাসো এভিয়েশন'—একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ায় তারা গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
ভূ-রাজনীতি ও সামরিক সক্ষমতায় ধাক্কা:
ইউরোপের বৃহত্তম এই প্রতিরক্ষা প্রকল্পের মূল স্তম্ভটি এমন এক সংবেদনশীল সময়ে বন্ধ হলো, যখন পশ্চিমা সামরিক কর্মকর্তারা রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা হুমকি সম্পর্কে ক্রমাগত সতর্কবার্তা দিচ্ছেন এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠন ও পুনরায় অস্ত্রসজ্জিত করার জন্য চাপ বাড়িয়ে চলেছে। থিঙ্ক ট্যাঙ্ক আইআইএসএস (IISS)-এর সামরিক মহাকাশ বিষয়ক সিনিয়র ফেলো ডগলাস ব্যারি এই পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “এটি ওয়াশিংটন বা মস্কো কাউকেই কোনো সংকেত দেওয়ার মতো আদর্শ পরিস্থিতি নয়।”
প্রায় ১০০ বিলিয়ন ইউরো (১১৬ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের এই প্রকল্পে জার্মানি ও ফ্রান্সের পাশাপাশি স্পেনও অন্তর্ভুক্ত ছিল। দশকের পর দশক ধরে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগের পর ইউরোপ যখন নিজের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনে সংগ্রাম করছে, তখন এই ব্যর্থতা তাদের সেই সীমাবদ্ধতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলল।
অচলাবস্থার নেপথ্য কারণ ও চাহিদার ভিন্নতা:
ড্রোন-সমর্থিত এবং একটি গোপনীয় ‘কমব্যাট ক্লাউড’ দ্বারা সংযুক্ত একটি অত্যাধুনিক মূল যুদ্ধবিমানকে কেন্দ্র করে এই মহাপরিকল্পনাটি গড়ে উঠেছিল। কিন্তু এর নিয়ন্ত্রণ, বৈশিষ্ট্য এবং পরবর্তী উন্নয়ন পর্যায়ের মেধাস্বত্বে (Intellectual Property) প্রবেশাধিকার নিয়ে উভয় পক্ষ বিবাদে জড়িয়ে পড়ে।
এছাড়া, দুই দেশের বিমান বাহিনীর চাহিদাও ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, তার দেশের বিমান বাহিনীর জন্য চালকসহ ষষ্ঠ প্রজন্মের একটি যুদ্ধবিমান তৈরি করা আদৌ যুক্তিযুক্ত কিনা। তিনি স্পষ্ট জানান, জার্মানির এমন কোনো পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম বিমানের প্রয়োজন নেই যা বিমানবাহী রণতরীতে (Aircraft Carrier) অবতরণ করতে পারে—যা মূলত ফ্রান্সের নৌবাহিনীর জন্য একটি প্রধান শর্ত ছিল।
এই অচলাবস্থা প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের ১৯৮০-এর দশকের সেই ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, যখন ঠিক একই ধরনের মতবিরোধের জেরে 'ইউরোফাইটার' প্রকল্প থেকে ফ্রান্স নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিল। প্রকল্পটির ফরাসি সংক্ষিপ্ত রূপ উল্লেখ করে যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ফ্রান্সিস তুসা মন্তব্য করেন, “এসসিএএফ (SCAF) গত তিন বছর ধরেই মূলত লাইফ সাপোর্টে ছিল।”
প্রতীকী সমঝোতা ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা:
পুরো প্রকল্প ভেস্তে গেলেও উভয় পক্ষ একটি 'সম্মানজনক সমাধান'-এর পথ খুঁজছে। কর্মকর্তারা এমন একটি কূটনৈতিক সূত্র বের করার চেষ্টা করছেন, যা ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁকে পুরো প্রকল্পটির সম্পূর্ণ ব্যর্থতা ঘোষণা না করেই মূল যুদ্ধবিমানটি ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ দেবে।
চুক্তি অনুযায়ী, মূল যুদ্ধবিমানের অংশটি বাতিল হলেও এর বাইরের অন্যান্য সিস্টেম, যেমন অত্যন্ত সুরক্ষিত ইন্টারনেট সংযোগের ‘কমব্যাট ক্লাউড’, আগের নামেই অর্থাৎ 'ফিউচার কমব্যাট এয়ার সিস্টেম' বা এফসিএএস (FCAS) হিসেবে বিকশিত হতে থাকবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমঝোতাটি মূলত প্রতীকী। কারণ 'এফসিএএস' একটি সাধারণ সামরিক টার্ম বা নাম, যা কেবল এই নির্দিষ্ট পরিকল্পনার জন্য অনন্য নয়।
মিশ্র প্রতিক্রিয়া:
২০১৭ সালে জার্মানির তৎকালীন চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের সাথে যৌথভাবে এই প্রকল্পটির সূচনা করেছিলেন এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। তার দপ্তর পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, ফ্রান্স এখনও মনে করে ফ্রাঙ্কো-জার্মান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা উভয় দেশ ও সমগ্র ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য একটি অপরিহার্য উপাদান।
সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া না গেলেও, জার্মানির শক্তিশালী আইজি মেটাল (IG Metall) ইউনিয়ন এই প্রকল্প সমাপ্তির সিদ্ধান্তকে জোরালো স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, দাসো এবং এয়ারবাস যে সমান অংশীদারিত্বে সহযোগিতা করতে পারবে না, তা বহু আগেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ইউনিয়নের ডেপুটি চেয়ারম্যান ইয়ুর্গেন কার্নার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘একটি বিমান চলাচল কেন্দ্র হিসেবে জার্মানি এবং এর কর্মীদের স্বার্থে এই কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তটি নেওয়ার জন্য আমি ফ্রেডরিখ মের্জকে ধন্যবাদ জানাতে চাই।’