মুসলিমবিরোধী মন্তব্য করে নির্বাচনে হারলেন ট্রাম্প সমর্থীত প্রার্থী ওগলস

মুসলিমবিরোধী মন্তব্যের জন্য রিপাবলিকান প্রাইমারি নির্বাচনে হেরে গেছেন টেনেসির আইনপ্রণেতা অ্যান্ডি ওগলস। গত বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও এই পরাজয় ঘটে।

রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য ট্রাম্পের সমর্থনকে সাধারণত ‘গোল্ডেন টিকিট’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে দুই মেয়াদের কংগ্রেসম্যান ওগলসকে হারিয়ে রিপাবলিকান প্রাইমারিতে জয় পেয়েছেন দুগ্ধ খামারি ও অঙ্গরাজ্যের কৃষি কর্মকর্তা চার্লি হ্যাচার। তিনিও ট্রাম্পের প্রতি নিজের সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।

‘হায়ার আ ফার্মার’ স্লোগান নিয়ে প্রচারণা চালানো হ্যাচারের ওয়েবসাইটে তাকে ‘অস্ত্রপন্থী, গর্ভপাতবিরোধী ও ট্রাম্পপন্থী’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

নির্বাচনী প্রচারে ওগলসের চেয়ে বেশি অর্থও ব্যয় করেন হ্যাচার। বিভিন্ন বহিরাগত সংগঠনের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ তার প্রচারে যোগ হয়। তার নির্বাচনী কর্মসূচির অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করা।

ওগলসের পরাজনের পেছনে তার নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক একটি রায়ের পর ভোটাধিকার আইন দুর্বল হওয়ার সুযোগে এই সীমানা পুনর্নির্ধারণ সম্ভব হয়।

তবে ওগলসের রাজনৈতিক অবস্থানের বিতর্কিত দিকও ছিল। তিনি বিভিন্ন নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে নিয়ে বারবার কঠোর মন্তব্য করেছেন।

এখন মুছে ফেলা একটি এক্স পোস্টে গত জুনে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমেরিকায় সমকামিতার কোনো স্থান নেই।’

তবে মুসলিমদের নিয়ে তার মন্তব্য ছিল আরও কঠোর।

ইসরায়েলের কট্টর সমর্থক এবং কট্টর ডানপন্থী হাউস ফ্রিডম ককাসের সদস্য ওগলস মুসলিমদের লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটি কঠোর প্রস্তাব দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কয়েকটি দেশ থেকে অভিবাসন বন্ধে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান।

ওগলস আরও বলেছিলেন, ‘বৈচিত্র্যই আমাদের দুর্বলতা।’ তিনি প্রাকৃতিকীকরণের মাধ্যমে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়া মুসলিমদের, এমনকি নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানিকেও বহিষ্কারের আহ্বান জানান।

জুনে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ওগলস লেখেন, ‘জোহরান ‘লিটল মুহাম্মদ’ মামদানি একজন ইহুদিবিদ্বেষী, সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্ট, যিনি নিউইয়র্ক শহরকে ধ্বংস করবেন।’ তাকে ‘ডিপোর্ট’ করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ কারণে মামদানির বিরুদ্ধে নাগরিকত্ব বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করার আহ্বান জানান ওগলস।

চলতি বছরের শুরুতে মুসলিমদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কিত মন্তব্য করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন ওগলস। তিনি বলেছিলেন, আমেরিকান সমাজে মুসলিমদের কোনো স্থান নেই।

মার্চের শুরুতে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, ‘বহুত্ববাদ একটি মিথ্যা।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো জানিয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ যুদ্ধ শুরু করার পর এক্সে মুসলিমবিরোধী কনটেন্টের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট জানিয়েছে, ১ জানুয়ারি থেকে ৫ মার্চ পর্যন্ত মুসলিমদের অমানবিক হিসেবে উপস্থাপন, সমাজ থেকে বাদ দেওয়া এবং তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়া পোস্ট পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। ওই সময়ে ট্রাম্প নিয়মিত যুদ্ধ শুরুর হুমকি দিচ্ছিলেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর দিন মুসলিমবিরোধী এমন পোস্টের সংখ্যা প্রতিদিনের দুই হাজারের কিছু কম থেকে বেড়ে ছয় হাজারের বেশি হয়ে যায়।

কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর) ওগলসের মন্তব্যের নিন্দা জানিয়ে তাকে ‘মুসলিমবিরোধী উগ্রপন্থী’ হিসেবে অভিহিত করে।

সংগঠনটি জানায়, ওগলস তথাকথিত ‘শরিয়া-ফ্রি আমেরিকা ককাস’-এর সদস্য। সংগঠনটির দাবি, এই গোষ্ঠীর সদস্যরা এমন উগ্রপন্থী আইন সমর্থন করেন, যা কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামের চর্চা কার্যত নিষিদ্ধ হয়ে যেতে পারে।

সিএআইআর আরও বলেছে, ঔপনিবেশিক আমলে বিপুলসংখ্যক মুসলিমকে দাস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আনা হয়েছিল। সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, ইসলাম আমেরিকার একটি ধর্ম, যার উপস্থিতি দেশটির ঔপনিবেশিক যুগ থেকেই রয়েছে।

ওগলসের মন্তব্যের পর ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা দ্রুত নিন্দা জানান এবং তার বক্তব্যকে প্রকাশ্য ইসলামবিদ্বেষ হিসেবে উল্লেখ করেন।

জুডি চু তার মন্তব্যকে ‘জঘন্য’ বলে আখ্যা দেন। অন্যদিকে লিসা ব্লান্ট রচেস্টার রিপাবলিকান নেতাদের প্রকাশ্যে টেনেসির এই কংগ্রেসম্যানের বক্তব্যের নিন্দা জানানোর আহ্বান জানান।

হাউসের সংখ্যালঘু দলের হুইপ ক্যাথরিন ক্লার্ক এক্সে লেখেন, ‘এই জঘন্য বক্তব্য আমেরিকান সমাজে থাকার যোগ্য নয়। আর যেসব রিপাবলিকান এটি সমর্থন করেন, তারাও কংগ্রেসে থাকার যোগ্য নন।’

তবে ওগলসের বিরুদ্ধে প্রতিনিধি পরিষদে নিন্দা প্রস্তাব আনার মতো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। নিন্দা প্রস্তাব মূলত প্রতীকী হলেও তার বিরুদ্ধেও এমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

গত বছর ফিলিস্তিনি-আমেরিকান কংগ্রেসওম্যান রাশিদা তালিবকে ‘নদী থেকে সাগর পর্যন্ত ফিলিস্তিন স্বাধীন হবে’ বক্তব্য ব্যবহারের কারণে নিন্দা প্রস্তাবের মুখে পড়তে হয়েছিল।

অ্যান্ডি ওগলসের বর্তমান কংগ্রেস মেয়াদ ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে শেষ হবে।

 সূত্র: মিডল ইস্ট আই