ন্যাটোভুক্ত দেশে হামলা চালাতে পারে রাশিয়া

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১০:১৭ এএম

ন্যাটো জোটের প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা যাচাই করতে রাশিয়া আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জোটের কোনো সদস্য দেশের ওপর হামলা চালাতে পারে বলে সতর্ক করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা গেছে, মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, চলতি শরৎকাল থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে যেকোনো সময় পূর্ব ইউরোপে সীমিত স্থল অনুপ্রবেশ কিংবা সাইবার হামলার মাধ্যমে উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে মস্কো।

এর আগে মার্কিন গোয়েন্দাদের মূল্যায়ন ছিল, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া জড়িয়ে থাকায় প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অন্য কোনো দেশে সরাসরি হামলা চালানোর ঝুঁকি নেবেন না। নতুন মূল্যায়নে সেই অবস্থান থেকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

এর মধ্যেই পোল্যান্ড ও বাল্টিক অঞ্চলে সম্ভাব্য রুশ উসকানির আশঙ্কা নিয়ে ইউরোপীয় ও মার্কিন গোয়েন্দাদের উদ্বেগ বেড়েছে। গত মাসে দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পোল্যান্ডের ভূখণ্ডে সশস্ত্র উসকানি, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা এবং ইউক্রেনের ওপর দায় চাপাতে সাজানো বা ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ হামলার পরিকল্পনার ইঙ্গিত পেয়েছেন গোয়েন্দারা।

গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইউরোপের ন্যাটো সদস্যদের মধ্যে বিভাজন তৈরি এবং ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমা সমর্থন দুর্বল করাই এ ধরনের কর্মকাণ্ডের অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে।

রাশিয়ার সম্ভাব্য উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে পোল্যান্ডে একটি রুশ ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়া এবং জার্মানির লাইপজিগ/হ্যালে বিমানবন্দরে বিস্ফোরক বহনকারী একটি ড্রোন পাওয়ার পর।

মঙ্গলবার বিমানবন্দরে একটি ইউক্রেনীয় কার্গো বিমানের পাশে বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোনটি পাওয়া যায়। ড্রোনটির উৎস এখনো নিশ্চিত নয়। তবে জার্মানির কয়েকজন রাজনীতিক এ ঘটনার জন্য মস্কোকে দায়ী করেছেন।

মধ্যরাতের কিছুক্ষণ আগে ড্রোনটি শনাক্ত হওয়ার পর জার্মান কর্তৃপক্ষ সন্ত্রাসবিরোধী তদন্ত শুরু করে। ঘটনাটির কারণে বিমানবন্দরটি সাময়িকভাবে বন্ধও রাখা হয়। বিমানবন্দরটি জার্মান সামরিক বাহিনী ও ন্যাটোর মিত্রদের সামরিক সরঞ্জাম পরিবহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ন্যাটো জানিয়েছে, তারা ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত রয়েছে। ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলে রাশিয়ার হুমকি নিয়ে কয়েক মাস ধরেই পোল্যান্ড ও বাল্টিক দেশগুলোর নেতারা সতর্ক করে আসছেন।

বৃহস্পতিবার লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্টাস কাউনাস অভিযোগ করেন, ক্রেমলিন বাল্টিক দেশগুলোতে হামলার জন্য ইউক্রেনে তৈরি ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনা করতে পারে। তাঁর মতে, ইউরোপে বিভাজন সৃষ্টি এবং ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমা সমর্থন দুর্বল করতেই মস্কো এ ধরনের সাজানো হামলার পথ বেছে নিতে পারে।

একই দিন যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংও রাশিয়ার কর্মকাণ্ড নিয়ে সতর্ক করেন। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে রাশিয়ার উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের যেসব খবর প্রকাশ্যে আসছে, তা সম্ভাব্য হুমকির কেবল ‘হিমশৈলের চূড়া’।

স্ট্রিটিং গত মাসে ইংলিশ চ্যানেলে রুশ যুদ্ধজাহাজ ‘নিউস্ট্রাশিমি’র লাইভ-ফায়ার মহড়ার কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং উসকানিমূলক।

মার্কিন গোয়েন্দাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, রাশিয়ার সম্ভাব্য পদক্ষেপের মধ্যে সাইবার হামলা, কোনো এলাকায় পরিচয় গোপনকারী সশস্ত্র গোষ্ঠী পাঠানো, নাশকতা কিংবা ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলে সীমিত স্থল অনুপ্রবেশ থাকতে পারে।

তবে সরাসরি স্থল হামলার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ এ ধরনের হামলা হলে ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এই ধারার মূলনীতি হলো—এক সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে পুরো জোটের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা।

দ্য টেলিগ্রাফকে কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, ন্যাটোর সাম্প্রতিক গোয়েন্দা মূল্যায়নে সরাসরি সামরিক হামলার বদলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, নাশকতা ও অন্যান্য হাইব্রিড কৌশল ব্যবহারের সম্ভাবনাই বেশি বলে ধারণা করা হয়েছে। কারণ সামরিকভাবে পুরো ন্যাটো জোটকে মোকাবিলা করা রাশিয়ার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।

ন্যাটোর মুখপাত্র কর্নেল মার্টিন ও’ডোনেল বলেছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী জোট প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই ন্যাটো তার প্রস্তুতি অব্যাহত রাখছে বলেও জানান তিনি।

মার্কিন গোয়েন্দাদের ধারণা, ন্যাটোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য উসকানির অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে জোটের সদস্যদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করা এবং ইউক্রেনকে সামরিক ও রাজনৈতিক সহায়তা দেওয়া থেকে তাদের বিরত রাখা।

এরই মধ্যে লিথুয়ানিয়া ও পোল্যান্ডের আকাশসীমা ঘিরে একাধিক ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত মে মাসে ভিলনিয়াসের দিকে উড়ে আসা একটি আক্রমণকারী ড্রোন ঠেকাতে ন্যাটোর যুদ্ধবিমান পাঠানোর পর লিথুয়ানিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে নিরাপদ বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে হয়েছিল।

এ ছাড়া গত মাসে পোল্যান্ডের একটি গ্রামের কাছে একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ার ঘটনায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে ‘বেপরোয়া’ হামলার অভিযোগ তোলে ন্যাটো। ইউক্রেন সীমান্ত থেকে প্রায় ৬০ মাইল দূরে টারনাওয়া-কোলোনিয়া গ্রামের কাছে পড়া ওই ক্ষেপণাস্ত্রটি রুশ কেএইচ-১০১ বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিস্ফোরণে সেখানে প্রায় ১০ মিটার প্রশস্ত একটি গর্ত তৈরি হয়।

সব মিলিয়ে, ইউক্রেন যুদ্ধ চলমান থাকা অবস্থায় ন্যাটোর পূর্বাঞ্চল ঘিরে রাশিয়ার সম্ভাব্য সাইবার হামলা, নাশকতা ও সীমিত সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কা নিয়ে পশ্চিমা গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

AM/YA
আরও পড়ুন