দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পার্ল হারবারে বীরত্ব দেখানো কৃষ্ণাঙ্গ নৌসেনা ডোরিস মিলারের নামে নির্মাণাধীন একটি বিমানবাহী রণতরীর নাম পরিবর্তনের কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী। সম্ভাব্য নতুন নাম হিসেবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম নিয়েও অভ্যন্তরীণ আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে সিএনএন।
বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত তিনটি সূত্রের বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, বর্তমানে নির্মাণাধীন ফোর্ড শ্রেণির এই বিমানবাহী রণতরীটির নাম ২০২০ সালে ইউএসএস ডোরিস মিলার রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তবে চলতি বছরের শুরু থেকেই নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা চলছে।
সূত্রগুলোর দুজনের দাবি, নতুন নাম হিসেবে ট্রাম্পকে সম্মান জানানোর বিষয়টি নৌবাহিনীর অভ্যন্তরে আলোচনা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আর দায়িত্বে থাকা কোনো প্রেসিডেন্টের নামে বিমানবাহী রণতরী নামকরণ করা হলে সেটি হবে নজিরবিহীন ঘটনা।
একটি সূত্র জানিয়েছে, ডোরিস মিলারের নাম অন্য একটি যুদ্ধজাহাজে দেওয়ার কথা ভাবছে নৌবাহিনী। একই সঙ্গে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সামরিক বীরত্ব পদক মেডেল অব অনারের জন্য মনোনীত করার সুপারিশও করা হচ্ছে।
মিলারের পরিবারের সদস্য থমাস ব্লেডসো জানিয়েছেন, নৌবাহিনীর এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাদের আগে জানানো হয়নি। তবে বহু বছর ধরে মিলারকে মেডেল অব অনার দেওয়ার দাবিতে কাজ করে আসা পরিবারটি পদক দেওয়ার সুপারিশকে ইতিবাচকভাবে দেখছে।
ডোরিস মিলার ছিলেন টেক্সাসের ওয়াকোর বাসিন্দা এবং ১৯৩৯ সালে মার্কিন নৌবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর জাপানের পার্ল হারবারে হামলার সময় তিনি আহত কমান্ডিং অফিসারকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বিমানবিধ্বংসী একটি কামান পরিচালনা করেন। অস্ত্রটি চালানোর আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না থাকলেও তিনি জাপানি বিমানের দিকে গুলি চালান এবং গোলাবারুদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান।
এই বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৪২ সালে অ্যাডমিরাল চেস্টার নিমিটজ তাকে নেভি ক্রস পদক দেন।
পরে ১৯৪৩ সালে মাকিন যুদ্ধে জাপানি সাবমেরিনের টর্পেডো হামলায় তার জাহাজ আক্রান্ত হলে মিলার নিহত হন।
২০২০ সালে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ডোরিস মিলারের নামে নতুন বিমানবাহী রণতরীটির নাম ঘোষণা করা হয়েছিল। এটি হতো মার্কিন নৌবাহিনীর ইতিহাসে কোনো সাধারণ নাবিকের নামে নামকরণ করা প্রথম বিমানবাহী রণতরী এবং কোনো কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন নাগরিকের নামে নামকরণ করা প্রথম ক্যারিয়ার।
এদিকে নৌবাহিনী জাহাজটির নাম পরিবর্তনের বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেয়নি। প্রতিরক্ষা দপ্তরের একজন মুখপাত্রও এ মুহূর্তে এ বিষয়ে জানানোর মতো কিছু নেই বলে জানিয়েছেন।
নির্মাণাধীন জাহাজটির বর্তমান পরিচিতি সিভিএন-৮১। নাম নিয়ে আলোচনা চলায় নৌবাহিনী অভ্যন্তরীণভাবে ইউএসএস ডোরিস মিলার নামের পরিবর্তে শুধু এই নম্বর ব্যবহার করছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। চলতি বছরের শেষ দিকে জাহাজটির কিল স্থাপনের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে তার আগেই নাম চূড়ান্ত করার জন্য নৌবাহিনীর হাতে সময়ও কমে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরীগুলোর বড় একটি অংশ সাবেক প্রেসিডেন্টদের নামে হলেও সব ক্যারিয়ার প্রেসিডেন্টদের নামে নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মার্কিন নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার অ্যাডমিরাল চেস্টার নিমিটজের নামেও একটি ক্যারিয়ার রয়েছে।
ডোরিস মিলারের নাম পরিবর্তনের এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর সামরিক স্থাপনা ও জাহাজের নামকরণে বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তির সঙ্গে যুক্ত নামগুলো পুনর্বিবেচনা করছে। এর আগে নৌবাহিনীর একটি জাহাজের নামও পরিবর্তন করা হয়েছিল।
তবে মিলারের নামে ক্যারিয়ারের নামকরণ বাতিলের সম্ভাবনা নিয়ে সমালোচনাও তৈরি হতে পারে। কারণ পার্ল হারবারে তার বীরত্ব শুধু একজন নাবিকের সাহসিকতার গল্প নয়, মার্কিন নৌবাহিনীতে কৃষ্ণাঙ্গদের ভূমিকা ও ত্যাগেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সূত্র: সিএনএন