ইরানের মিনাব স্কুলে মার্কিন হামলার নেপথ্যে এআই ‘কিল চেইন’

ইরানের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নেপথ্যে ভুল গোয়েন্দা তথ্য, পুরোনো স্যাটেলাইট ছবি, দ্রুতগতিতে লক্ষ্য নির্ধারণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্ভর সামরিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সমন্বিত ব্যর্থতা কাজ করেছিল বলে উঠে এসেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের অভ্যন্তরীণ তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাবের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ এলিমেন্টারি স্কুলে দুটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে ১৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে; নিহতদের মধ্যে অন্তত ১২৩ জন শিশু ছিল।

ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের একটি অংশ বুঝতে পেরেছিলেন যে হামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের চালানো বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ব্লুমবার্গকে জানিয়েছেন। তবে পেন্টাগনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

কীভাবে স্কুলটি হামলার তালিকায় গেল

ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে জায়গায় স্কুলটি গড়ে উঠেছিল, সেটি বহু বছর আগে একটি সামরিক স্থাপনার অংশ ছিল এবং মার্কিন সামরিক তথ্যভাণ্ডারে সেটিকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির একটি স্থাপনা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা ছিল।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে এলাকাটির চেহারা বদলে যায়। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, স্কুলটি সামরিক স্থাপনা থেকে আলাদা করার জন্য দেয়াল ও প্রবেশপথ তৈরি করা হয়েছিল। ২০১৮ সালের ছবিতে স্কুলের রঙিন দেয়াল, ফুটবল মাঠ, শিশুদের খেলাধুলার জায়গা এবং সমাবেশের চিহ্নও দেখা যায়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের দিকে মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ স্থাপনাটির পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলেন এবং একটি পৃথক তথ্যব্যবস্থায় তা নথিবদ্ধও করেছিলেন। কিন্তু সেই তথ্য মূল সামরিক গোয়েন্দা ডেটাবেসে যুক্ত হয়নি। ফলে লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যবহৃত প্রধান ডেটাবেসে জায়গাটি পুরোনোভাবেই আইআরজিসি স্থাপনা হিসেবে থেকে যায়।

এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ সামরিক লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যবহৃত তথ্যব্যবস্থায় কোনো স্থানের পুরোনো শ্রেণিবিন্যাস থেকে গেলে পরবর্তী পর্যায়ের বিশ্লেষণেও সেই ভুল তথ্য প্রভাব ফেলতে পারে।

কোথায় এআইয়ের ভূমিকা

ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের কিছু কর্মকর্তা ম্যাভেন স্মার্ট সিস্টেমের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করেছিলেন।

ম্যাভেন হলো পালান্টির টেকনোলজিসের তৈরি একটি এআই-সমর্থিত সামরিক ব্যবস্থা। এটি বিভিন্ন উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ তথ্য একত্র করে সামরিক কমান্ডারদের জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ, অপারেশন সমন্বয় এবং কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোলের মতো কাজে সহায়তা করতে পারে। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, সিস্টেমটি ১৫০টির বেশি তথ্য-উৎস একত্র করে বিশ্লেষণের জন্য একটি সমন্বিত চিত্র তৈরি করতে পারে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিবেদনটি বলছে না যে এআই নিজে স্বাধীনভাবে স্কুলটিকে হামলার লক্ষ্য হিসেবে নির্বাচন করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। বরং এআই-নির্ভর ব্যবস্থাটি ভুল বা পুরোনো তথ্যের ওপর কাজ করা একটি বৃহত্তর সামরিক লক্ষ্য-নির্ধারণ প্রক্রিয়ার অংশ ছিল।

ব্লুমবার্গের অনুসন্ধান অনুযায়ী, কিছু কর্মকর্তা আশা করেছিলেন ম্যাভেন হয়তো পুরোনো তথ্য, অসঙ্গতি বা সমস্যাযুক্ত গোয়েন্দা তথ্য শনাক্ত করে সতর্ক করবে। কিন্তু ব্যবস্থাটি যে তথ্য পেয়েছিল, তার মূল ভিত্তিই যদি ভুল বা পুরোনো হয়, তাহলে এআই সেই তথ্যকে বিশ্লেষণ করলেও ভুলের মূল উৎসটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দূর করতে পারে না।

পালান্টিরের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, সফটওয়্যারটি ব্যবহৃত মূল গোয়েন্দা তথ্যের জন্য কোম্পানি দায়ী নয় এবং গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি শনাক্ত করার দায়িত্বও সফটওয়্যারের নয়। ব্লুমবার্গ-ভিত্তিক প্রতিবেদনে এমনও বলা হয়েছে যে হামলার পর তথ্যের অসঙ্গতি শনাক্ত করতে নতুন কিছু টুল তৈরির কাজ করা হয়।

‘কিল চেইন’ কী?

সামরিক পরিভাষায় কিল চেইন বলতে একটি সম্ভাব্য লক্ষ্য শনাক্ত করা থেকে শুরু করে সেটিকে যাচাই, অনুমোদন এবং শেষ পর্যন্ত হামলা চালানোর পুরো প্রক্রিয়াকে বোঝায়।

প্রথাগতভাবে এতে গোয়েন্দা বিশ্লেষক, স্যাটেলাইট ও ছবি বিশ্লেষক, টার্গেটিং কর্মকর্তা, আইনজীবী, সামরিক কমান্ডার এবং হামলা পরিচালনাকারী সদস্যরা যুক্ত থাকেন।

ব্লুমবার্গের অনুসন্ধান অনুযায়ী, মিনাবের স্থাপনাটিও এই বহুস্তরীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর আগে বিপুলসংখ্যক লক্ষ্য দ্রুত চূড়ান্ত করার চাপ তৈরি হওয়ায় কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে যে কাজ করার কথা, তার অনেকটাই অল্প সময়ে সম্পন্ন করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্র এক হাজারের বেশি ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। এই ব্যাপক আক্রমণের প্রস্তুতির সময় লক্ষ্য চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছিল।

মিনাবের স্কুলটি পুরোনো সামরিক শ্রেণিবিন্যাসের কারণে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় আসে এবং পরে প্রথম দিনের হামলার জন্য সুপারিশ করা লক্ষ্যগুলোর একটি হয়ে ওঠে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

মানবিক পর্যালোচনাও ছিল না

ব্লুমবার্গের অনুসন্ধানে আরেকটি বিষয় উঠে এসেছে, বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন সামরিক ইউনিটগুলোর জনবল ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেন্টাগনের সিভিলিয়ান হার্ম মিটিগেশন বা বেসামরিক ক্ষতি কমানোর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন দলের জনবল প্রায় ৯০ শতাংশ কমে ২০ জনের নিচে নেমে আসে। সেন্টকমে সংশ্লিষ্ট দলটি ১০ জন থেকে একজন সদস্যে নেমে এসেছিল বলে কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে ব্লুমবার্গ জানিয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, হামলার আগে মিনাবের স্থাপনাটি কোনো বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনা দলের সদস্য পর্যালোচনা করেননি।

ফলে একটি পুরোনো গোয়েন্দা শ্রেণিবিন্যাস, নতুন তথ্য মূল ডেটাবেসে যুক্ত না হওয়া, দ্রুত লক্ষ্য নির্ধারণ, এআই-নির্ভর বিশ্লেষণ এবং বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি যাচাইয়ের সীমিত ব্যবস্থা, সবকিছু একই প্রক্রিয়ার মধ্যে এসে যায়।

আগেই উঠেছিল পুরোনো তথ্যের প্রশ্ন

মিনাব হামলার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যবহৃত গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মার্চে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছিল, স্কুল ভবনটি মার্কিন টার্গেট তালিকায় ছিল এবং সেটিকে সামরিক স্থাপনা হিসেবে ভুল শনাক্ত করা হয়ে থাকতে পারে। পত্রিকাটি স্যাটেলাইট বিশ্লেষণের ভিত্তিতে জানায়, স্কুলটি পুরোনো নৌঘাঁটির অংশ হলেও পরবর্তী সময়ে দেয়াল ও পৃথক প্রবেশপথ দিয়ে সামরিক অংশ থেকে আলাদা করা হয়েছিল।

জাতিসংঘের ইরানবিষয়ক স্বাধীন ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনও পরে মিনাব হামলার বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করে। মিশনটি বলেছে, স্কুলটি একটি স্পষ্টভাবে শনাক্তযোগ্য বেসামরিক স্থাপনা ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের হামলা নিয়ে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের ক্ষেত্রে ‘যৌক্তিক ভিত্তি’ রয়েছে।

এআই যুদ্ধকে কতটা বদলে দিচ্ছে?

মিনাবের ঘটনা সামরিক ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে, এআই কি যুদ্ধক্ষেত্রে ভুল কমায়, নাকি ভুল তথ্যকে আরও দ্রুত সিদ্ধান্তে পরিণত করতে পারে?

এআই বিপুল পরিমাণ তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করতে পারে। ফলে হাজার হাজার সম্ভাব্য লক্ষ্য, স্যাটেলাইট ছবি, গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক ডেটা মানুষের তুলনায় দ্রুত পর্যালোচনা করা সম্ভব। কিন্তু কোনো সিস্টেমের কাছে থাকা তথ্য যদি পুরোনো, অসম্পূর্ণ বা ভুল হয়, তাহলে দ্রুত বিশ্লেষণ সেই সমস্যার সমাধান নাও করতে পারে।

মিনাবের ঘটনায় ব্লুমবার্গের অনুসন্ধান মূলত এই ঝুঁকিটিই সামনে এনেছে। এখানে অভিযোগটি শুধু এআই ব্যবহারের বিরুদ্ধে নয়; বরং ভুল তথ্য + দ্রুত লক্ষ্য নির্ধারণ + এআই-নির্ভর বিশ্লেষণ + পর্যাপ্ত মানবিক যাচাইয়ের ঘাটতি, এই সমন্বিত ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার দিকে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইঙ্গিত করেছেন।

তবে পেন্টাগনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত পুরো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে বাইরের পর্যবেক্ষকদের কাছে তথ্য সীমিত। একইভাবে ম্যাভেন সফটওয়্যার নিজেই হামলার কারণ ছিল, এমন সরাসরি প্রমাণও প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। বরং প্রকাশিত অনুসন্ধানগুলো এআইকে বৃহত্তর লক্ষ্য-নির্ধারণ ব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

মিনাবের ঘটনাটি তাই আধুনিক যুদ্ধের একটি বড় প্রশ্নকে সামনে এনেছে: যখন যুদ্ধক্ষেত্রে হাজার হাজার লক্ষ্য দ্রুত বাছাই করতে এআই ব্যবহৃত হয়, তখন পুরোনো বা ভুল তথ্য শনাক্ত করার এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে কার্যকর মানবিক যাচাই নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?