ইরান যুদ্ধের সময় মার্কিন নৌবাহিনীতে ৮ আত্মহত্যার চেষ্টা

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৫ এএম

ইরান যুদ্ধের সময় দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনে থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এর নেতৃত্বাধীন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে অন্তত আটটি আত্মহত্যার চেষ্টা হয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সচিব হুং কাও সিনেটর কির্স্টেন গিলিব্র্যান্ডের প্রশ্নের জবাবে দেওয়া এক চিঠিতে এ তথ্য জানিয়েছেন।

তবে এসব ঘটনায় কোনো মার্কিন সামরিক সদস্য আত্মহত্যা করে মারা যাননি বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। আটটি ঘটনার সবগুলোও সরাসরি লিংকন রণতরীর ভেতরে ঘটেনি; এর মধ্যে রণতরীর নাবিক, ক্যারিয়ার এয়ার উইং, স্ট্রাইক গ্রুপ ও ডেস্ট্রয়ার স্কোয়াড্রনের সদস্য এবং সঙ্গে থাকা অন্যান্য জাহাজের কর্মীরাও অন্তর্ভুক্ত।

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ২০২৫ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া থেকে সমুদ্রে যাত্রা করে। শুরুতে এর দায়িত্ব ছিল দক্ষিণ চীন সাগরকেন্দ্রিক। পরে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার আগে রণতরীটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হয়।

দীর্ঘ এই মোতায়েনে লিংকন প্রায় ২৮৬ দিন সমুদ্রে ছিল। চলতি বছরের বড় একটি সময় জাহাজটি দীর্ঘ বিরতিহীন সমুদ্রযাত্রার মধ্যে ছিল এবং ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানে সহায়তা করে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে থাইল্যান্ডে জাহাজটির বিরতি ঘটে।

ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপটিতে কয়েকটি জাহাজ মিলিয়ে প্রায় ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার নৌসদস্য ছিল বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নৌবাহিনীর চিঠিতে আটটি আত্মহত্যার চেষ্টার মধ্যে দুটি ঘটনার বিস্তারিতও তুলে ধরা হয়েছে।

এর একটি ঘটে আগস্টের শুরুতে। ক্যারিয়ার এয়ার উইংয়ের একজন নাবিক জাহাজ থেকে সমুদ্রে পড়ে যান বা ঝাঁপ দেন। একটি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার দ্রুত তাকে উদ্ধার করে। পরে তাকে জাহাজ থেকে সরিয়ে চিকিৎসা ও পরবর্তী পরিচর্যার জন্য পাঠানো হয়।

আরেকজন নাবিক মার্চে জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে তার সহকর্মীরা সময়মতো তাকে থামিয়ে দেন এবং পরে তাকে নিজ ঘাঁটিতে ফেরত পাঠানো হয়।

মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের এক কর্মকর্তা সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, আটটি ঘটনার মধ্যে দুটি ইরানের সঙ্গে সক্রিয় যুদ্ধ চলাকালীন ঘটেছিল।

লিংকনের দীর্ঘ মোতায়েন নিয়ে আগস্টে মার্কিন সামরিক সদস্যদের পরিবার ও কয়েকজন আইনপ্রণেতা উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার কারণে নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে। পাশাপাশি খাবারের ঘাটতি, সরবরাহ সমস্যা ও জাহাজের স্যানিটেশন এবং প্লাম্বিং ব্যবস্থা নিয়েও অভিযোগ ওঠে।

এসব অভিযোগের পর বিষয়টি মার্কিন রাজনীতিতেও আলোচনায় আসে। সিনেটর কির্স্টেন গিলিব্র্যান্ড লিংকনের নাবিকদের জীবনযাত্রা ও মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে নৌবাহিনীর কাছে তথ্য চান। সেই প্রশ্নের জবাবেই আটটি আত্মহত্যার চেষ্টার তথ্য প্রকাশ্যে আসে।

তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর এর আগে জাহাজের পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত কিছু অভিযোগকে অতিরঞ্জিত বা ভুলভাবে উপস্থাপিত বলে দাবি করেছিল। নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সদস্যদের কাউন্সেলর, চ্যাপলেইন এবং অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

আটটি আত্মহত্যার চেষ্টার সংখ্যা নিয়ে মার্কিন সামরিক মহলে ভিন্ন ধরনের মূল্যায়ন রয়েছে। সিএনএনের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত এক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা এটিকে সাম্প্রতিক ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপগুলোর তুলনায় বেশি বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, সাধারণত এ ধরনের মোতায়েনে বছরে এক বা দুটি আত্মহত্যার চেষ্টা দেখা গেছে।

অন্যদিকে সিএনএনের প্রতিবেদনে মার্কিন নৌবাহিনীর ২০২৪ সালের তথ্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ওই বছর প্রায় ৩ লাখ ৩৭ হাজার সক্রিয় নৌসদস্যের মধ্যে ৩৫৬টি আত্মহত্যার চেষ্টা নথিভুক্ত হয়েছিল। অর্থাৎ শুধু সংখ্যার ভিত্তিতে লিংকন স্ট্রাইক গ্রুপের ঘটনাগুলোকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বলা হবে কি না, তা নির্ভর করে জনবল, সময়কাল ও মোতায়েনের ধরন বিবেচনার ওপর।

যুদ্ধের চাপ ও দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা

একটি বিমানবাহী রণতরীর দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকা নিজেই কঠিন সামরিক দায়িত্ব। এর সঙ্গে যদি টানা যুদ্ধ প্রস্তুতি, নিয়মিত সতর্কতা, সীমিত বন্দরে প্রবেশ এবং সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ যুক্ত হয়, তাহলে কর্মীদের ওপর চাপের মাত্রা আরও বাড়তে পারে এমন মত দিয়েছেন কিছু মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা।

তবে প্রকাশিত তথ্য থেকে কোনো নির্দিষ্ট আত্মহত্যার চেষ্টার কারণকে সরাসরি ইরান যুদ্ধ, দীর্ঘ মোতায়েন বা জাহাজের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি। প্রতিটি ঘটনার পেছনে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক একাধিক কারণ থাকতে পারে।

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘ মোতায়েন শেষ পর্যন্ত মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য শুধু সামরিক সক্ষমতার পরীক্ষা নয়, বরং দীর্ঘ যুদ্ধকালীন মোতায়েনে সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য ও কল্যাণ ব্যবস্থার সক্ষমতাও সামনে নিয়ে এসেছে। আটটি আত্মহত্যার চেষ্টার তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় এখন সেই ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও প্রশ্ন উঠেছে।

এএম
আরও পড়ুন