জাতিসংঘ দিবস আজ

৮১ বছরেও কেন যুদ্ধ থামাতে পারছে না জাতিসংঘ?

আজ ২৪ অক্টোবর, জাতিসংঘ দিবস। ১৯৪৫ সালের এই দিনে জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর বিশ্বে আরেকটি বড় যুদ্ধ ঠেকানো, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো ছিল জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ২০২৬ সালে সংস্থাটির প্রতিষ্ঠার ৮১ বছর পূর্ণ হলো।

কিন্তু আট দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বিশ্বের নানা প্রান্তে যুদ্ধ, সংঘাত ও মানবিক বিপর্যয় অব্যাহত রয়েছে। কোথাও আঞ্চলিক বিরোধ বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জটিল হয়ে উঠছে, কোথাও যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ ভেস্তে যাচ্ছে, আবার কোথাও বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে পরিণত হচ্ছে।

এসব পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে যাত্রা শুরু করা জাতিসংঘ কেন যুদ্ধ থামাতে পারছে না? সংস্থাটির ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা কোথায়, আর সদস্যরাষ্ট্রগুলোর দায়ই বা কতটা?

জাতিসংঘের যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান দায়িত্ব নিরাপত্তা পরিষদের। এই পরিষদের সদস্য ১৫টি দেশ। এর মধ্যে পাঁচটি স্থায়ী সদস্য হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন। বাকি ১০টি সদস্য নির্দিষ্ট মেয়াদে নির্বাচিত হয়।

নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের প্রত্যেকের রয়েছে ভেটো ক্ষমতা। ফলে গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রস্তাবের বিপক্ষে একজন স্থায়ী সদস্য ভেটো দিলে সেটি গৃহীত হতে পারে না। এর ফলে যুদ্ধবিরতি, নিষেধাজ্ঞা কিংবা সংঘাত মোকাবিলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

এই ব্যবস্থার পেছনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের ইতিহাস রয়েছে। প্রতিষ্ঠাকালীন কাঠামোয় বড় শক্তিগুলোকে যুক্ত রাখার লক্ষ্য থাকলেও বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে এই ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি দীর্ঘদিনের।

জাতিসংঘকে অনেক সময় এমন একটি বিশ্বসরকার হিসেবে কল্পনা করা হয়, যে চাইলে যেকোনো দেশের যুদ্ধ বন্ধ করে দিতে পারে। বাস্তবে সংস্থাটির ক্ষমতা এতটা বিস্তৃত নয়।

জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রধান দায়িত্ব নিরাপত্তা পরিষদের। পরিষদ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে, শান্তিরক্ষা অভিযান অনুমোদন করতে পারে এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বলপ্রয়োগের অনুমোদনও দিতে পারে। কিন্তু এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা, রাজনৈতিক সমর্থন এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, জাতিসংঘের মহাসচিব বা সাধারণ পরিষদের আহ্বান কূটনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে; কিন্তু সেগুলো সব ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্তের সমান নয়। ফলে যুদ্ধরত পক্ষগুলো আলোচনা প্রত্যাখ্যান করলে কিংবা নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধা দিলে সংঘাত থামানো কঠিন হয়ে পড়ে।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমও সাধারণত নির্দিষ্ট ম্যান্ডেট বা দায়িত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। শান্তিরক্ষীরা সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি, দায়িত্ব ও নিরাপত্তার সীমার মধ্যে কাজ করেন; তাঁদের উপস্থিতি মানেই সব ধরনের যুদ্ধ বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা নয়। 

জাতিসংঘ কোনো স্বাধীন বিশ্বশক্তি নয়; এর সদস্যরাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান ও সহযোগিতার ওপর সংস্থাটির কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভরশীল। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সামরিক ও কৌশলগত স্বার্থ, আঞ্চলিক মিত্রতা এবং অর্থনৈতিক বিবেচনা অনেক সময় শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে জটিল করে তোলে।

কোনো সংঘাতে এক পক্ষকে সমর্থনকারী শক্তিধর দেশ যদি অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিরোধিতা করে, তাহলে নিরাপত্তা পরিষদে ঐকমত্য তৈরি করা কঠিন হতে পারে। আবার যুদ্ধরত পক্ষগুলো আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করলে কূটনৈতিক উদ্যোগও ফলহীন হয়ে পড়তে পারে।

তাই জাতিসংঘের ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা করতে হলে শুধু সংস্থাটির কাঠামো নয়, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর আচরণও বিবেচনায় নিতে হয়। যে রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষার অঙ্গীকার করেছে, তাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া সেই অঙ্গীকার বাস্তবে রূপ দেওয়া কঠিন।


নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার প্রতিফলন। কিন্তু গত আট দশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন এসেছে। এ কারণে পরিষদের সদস্যসংখ্যা, প্রতিনিধিত্ব এবং ভেটো ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে।

অনেক দেশ মনে করে, বর্তমান পরিষদে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল ও বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব আরও বাড়ানো প্রয়োজন। তবে সংস্কারের বিষয়ে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কীভাবে নতুন সদস্য যুক্ত হবে, স্থায়ী সদস্যপদ বাড়বে কি না এবং ভেটো ক্ষমতার ভবিষ্যৎ কী হবে—এসব প্রশ্নে এখনো সর্বসম্মত সমাধান হয়নি।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার নিয়ে আন্তসরকারি আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। 

যুদ্ধ বন্ধে সীমাবদ্ধতা থাকলেও জাতিসংঘের ভূমিকা শুধু যুদ্ধবিরতির আহ্বানে সীমিত নয়। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় শান্তিরক্ষা অভিযান পরিচালনা, শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষকে সহায়তা, খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহ, শিশুদের সুরক্ষা, মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ এবং কূটনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্র তৈরিতে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে।

এসব উদ্যোগ সব সময় যুদ্ধের মূল কারণ দূর করতে পারে না। তবু বিপর্যস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো, সংঘাতের ক্ষতি কমানো এবং রাজনৈতিক সমাধানের সুযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রে এগুলোর গুরুত্ব রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি, রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম সমতা এবং বলপ্রয়োগের ওপর বিধিনিষেধ জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতির অংশ। সনদে বর্ণিত এসব নীতি আন্তর্জাতিক আচরণের একটি সাধারণ কাঠামো তৈরি করেছে। 

জাতিসংঘ দিবসে তাই প্রশ্নটি শুধু সংস্থাটি কতটা সফল বা ব্যর্থ, তা নয়; বরং বিশ্বশান্তির অঙ্গীকার করা রাষ্ট্রগুলো নিজেরাই সেই অঙ্গীকার কতটা পালন করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ভেটো ব্যবস্থার সংস্কার, নিরাপত্তা পরিষদে অধিকতর প্রতিনিধিত্ব, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের জবাবদিহি এবং শান্তিপূর্ণ আলোচনার কার্যকর পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর সদিচ্ছা ও সদস্যরাষ্ট্রগুলোর বাস্তব সহযোগিতা ছাড়া কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানই স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না।

১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিল আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ ঠেকানোর প্রত্যয়। ৮১ বছর পরও সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি—এটি যেমন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথা বলে, তেমনি রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ঘাটতিও সামনে আনে।

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব তাই এককভাবে জাতিসংঘের নয়। জাতিসংঘ কার্যকর হবে কি না, তা অনেকাংশে নির্ভর করে এর সদস্যরাষ্ট্রগুলো কতটা আন্তরিকভাবে শান্তি, সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে তার ওপর।