আসুন জেনে নেই পবিত্র কাবার গিলাফের অজানা ইতিহাস

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৮ এএম

পবিত্র মক্কার মসজিদুল হারামে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্যগুলোর একটি—কালো রেশমে মোড়ানো পবিত্র কাবাঘর। এর গায়ে সোনালি হরফে লেখা কোরআনের আয়াত, চারদিকে জড়িয়ে থাকা কারুকার্যখচিত বেল্ট আর দরজার ওপর ঝুলে থাকা অলংকৃত পর্দা। এই আবরণই ‘কিসওয়া’ বা কাবার গিলাফ।

কিন্তু এই গিলাপের পেছনে রয়েছে এমন কিছু তথ্য, যা অনেকেরই অজানা। কতটুকু রেশম লাগে এতে? সোনালি নকশা কি সত্যিকারের সোনা দিয়ে তৈরি? কে তৈরি করেন এই গিলাপ? পুরোনো গিলাফের কী হয়? আর কেনই-বা এর রং কালো?

১. গিলাফ তৈরিতে লাগে শত শত কেজি উপকরণ

কাবার গিলাফ তৈরি সাধারণ কোনো কাপড় বোনার কাজ নয়। এতে প্রয়োজন হয় বিশেষভাবে প্রস্তুত প্রাকৃতিক রেশম, সোনার প্রলেপযুক্ত রুপার সুতা, বিশুদ্ধ রুপা এবং তুলা।

সৌদি প্রেস এজেন্সির (এসপিএ) ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, একটি গিলাপ তৈরিতে ব্যবহার করা হয় প্রায় ৮২৫ কেজি প্রাকৃতিক রেশম, ১২০ কেজি সোনার প্রলেপযুক্ত রুপার সুতা, ৬০ কেজি বিশুদ্ধ রুপার সুতা এবং ৪১০ কেজি কাঁচা তুলা। গিলাপটির মোট ওজন প্রায় ১ হাজার ৪১৫ কেজি।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গিলাফের নকশায় ব্যবহৃত সুতাকে সরলভাবে ‘খাঁটি সোনার সুতা’ বলা ঠিক নয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের বর্ণনা অনুযায়ী, কোরআনের আয়াত ও অলংকরণে সোনার প্রলেপযুক্ত রুপার সুতা এবং বিশুদ্ধ রুপার সুতা ব্যবহার করা হয়।

সূত্র: সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ), ২৬ জুন ২০২৫।

২. গিলাফের প্রতিটি অংশ আলাদাভাবে তৈরি হয়

অনেকেই মনে করেন, কাবার গিলাফ একটি বিশাল কালো কাপড়, যা একসঙ্গে পুরো ঘরটিকে ঢেকে রাখে। বাস্তবে এটি কয়েকটি পৃথক অংশ জুড়ে তৈরি করা হয়।

২০২৫ সালের সৌদি সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গিলাফের চার পাশের জন্য চারটি প্রধান প্যানেল এবং কাবার দরজার জন্য একটি বিশেষ পর্দা থাকে। কাপড়ের অংশগুলো নির্দিষ্ট মাপে প্রস্তুত করে সেলাইয়ের মাধ্যমে একত্র করা হয়। এরপর সেগুলো কাবার গায়ে স্থাপন করা হয়।

২০২৫ সালের বিবরণে গিলাফের উচ্চতা প্রায় ১৪ মিটার বলা হয়েছে। দরজার পর্দাটি প্রায় ৬ দশমিক ৩৫ মিটার লম্বা এবং ৩ দশমিক ৩৩ মিটার চওড়া।

এত বড় কাপড়কে কাবার গায়ে নিখুঁতভাবে বসানো, চার কোণে ঠিকমতো মেলানো এবং অলংকৃত বেল্টকে সমান্তরালভাবে স্থাপন করা—সবই অত্যন্ত দক্ষতা ও সমন্বয়ের কাজ।

৩. গিলাফ তৈরিতে রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি ও হাতের কাজের সমন্বয়

কাবার গিলাপের উৎপাদনপ্রক্রিয়া শুরু হয় রেশম প্রস্তুত ও রং করার মাধ্যমে। এরপর কাপড় বোনা, নমুনা পরীক্ষা, নকশা ছাপানো, সূচিকর্ম, সেলাই এবং চূড়ান্ত সংযোজনের মতো একাধিক ধাপ অতিক্রম করতে হয়।

সৌদি প্রেস এজেন্সির ২০২৪ সালের বিবরণ অনুযায়ী, রেশমের সুতা বিশেষভাবে প্রস্তুত করার পর কালো রং করা হয়। এরপর কাপড়ের গুণমান ও ব্যবহৃত সুতার মান পরীক্ষাগারে যাচাই করা হয়। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রে কাপড় বোনা হলেও জটিল নকশা ও সূক্ষ্ম অলংকরণের ক্ষেত্রে দক্ষ কারিগরদের হাতের কাজ গুরুত্বপূর্ণ।

কাবার গিলাপ তৈরির জন্য মক্কায় রয়েছে কিং আবদুল আজিজ কমপ্লেক্স ফর দ্য কিসওয়া অব দ্য হোলি কাবা। এখানে বয়ন, মুদ্রণ, সূচিকর্ম, সেলাই ও সংযোজনের পৃথক বিভাগ রয়েছে।

অর্থাৎ, ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের সঙ্গে আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থার সমন্বয়েই তৈরি হয় পবিত্র কাবার এই বিশেষ আবরণ।

৪. সোনালি অক্ষরের পেছনে রয়েছে সূক্ষ্ম ক্যালিগ্রাফি

কাবার গিলাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এর ওপর সোনালি ও রুপালি হরফে লেখা কোরআনের আয়াত এবং ইসলামি অলংকরণ। এসব লেখা শুধু সাজসজ্জার অংশ নয়; এগুলো আরবি ক্যালিগ্রাফির দীর্ঘ ঐতিহ্যেরও পরিচায়ক।

সৌদি প্রেস এজেন্সির ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গিলাপের ওপরের অলংকৃত বেল্টে ‘সুলুস’ বা থুলুথ লিপিশৈলী ব্যবহার করা হয়। এই শৈলীর অক্ষরগুলো সুদৃশ্য, বাঁকসমৃদ্ধ এবং বড় আকারে লেখা যায়। সীমিত জায়গায় বেশি শব্দকে নান্দনিকভাবে উপস্থাপনের জন্যও এটি উপযোগী।

আয়াত ও অলংকরণ কাপড়ে বসানোর পর সেগুলোতে বিশেষ সূচিকর্ম করা হয়। এ কাজে অক্ষরের আকৃতি, ব্যবধান, রেখার ভারসাম্য এবং নকশার সামঞ্জস্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সোনালি অক্ষরগুলো দূর থেকেও দৃশ্যমান হলেও কাছে গেলে বোঝা যায়, প্রতিটি নকশার পেছনে রয়েছে অসংখ্য সূক্ষ্ম সেলাই ও পরিমিত কারিগরি কাজ।

৫. গিলাপ বদলের কাজ এক দিনে শুরু ও শেষ হয় না

প্রতিবছর কাবার গিলাপ পরিবর্তন করা হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে নতুন গিলাপ তৈরির কাজও ওই দিন শুরু হয়। নতুন গিলাপ প্রস্তুত করতে দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পনা, কাপড় তৈরি, নকশা, সূচিকর্ম ও মান যাচাইয়ের কাজ চলে।

সৌদি আরবের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ জুন গিলাপ পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ২৬ জুন পরিবর্তন সম্পন্ন হওয়ার কথা জানানো হয়। এ কাজে ১৫৪ জন প্রশিক্ষিত সৌদি কারিগর অংশ নেন।

পুরোনো গিলাপের অংশ খুলে ফেলা, নতুন গিলাপের প্যানেলগুলো কাবার গায়ে বসানো, কোণগুলো সেলাই করা এবং দরজার পর্দা স্থাপন—প্রতিটি ধাপ সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হয়।

গিলাপ পরিবর্তনের তারিখ সময়ের সঙ্গে প্রশাসনিকভাবে নির্ধারিত হয়েছে। তাই প্রতিবছর ঠিক একই হিজরি তারিখে এটি পরিবর্তন করা হয়—এমন ধারণা সব সময় সঠিক নয়।

৬. গিলাপের রং কালো কেন?

কাবার কালো গিলাপ মুসলিম বিশ্বের কাছে পরিচিত একটি দৃশ্য। তবে কাবার ইতিহাসের সব যুগে গিলাপের রং একই ছিল—এমন নয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে বিভিন্ন সময়ে সাদা, লাল, সবুজ ও কালোসহ একাধিক রঙের আবরণের কথা উল্লেখ পাওয়া যায়।

বর্তমানে কালো গিলাপের সঙ্গে সোনালি ক্যালিগ্রাফির যে পরিচিত রূপটি যুক্ত, তা দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও প্রশাসনিক ধারার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এখানে ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় মনে রাখা দরকার: কাবাকে গিলাপ দিয়ে আবৃত করা মুসলিম ঐতিহ্যের অংশ হলেও কালো রংটিকেই একমাত্র ধর্মীয়ভাবে বাধ্যতামূলক রং হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মতো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সতর্কতা প্রয়োজন। রঙের ইতিহাস ও গিলাপের ধর্মীয় মর্যাদা দুটি আলাদা বিষয়।

৭. গিলাপের দরজার পর্দা আলাদা বিশেষত্ব বহন করে

কাবার দরজার সামনে ঝুলে থাকা অলংকৃত পর্দাকে সাধারণত ‘সিতারা’ বলা হয়। এটি গিলাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কারুকার্যসমৃদ্ধ অংশ।

সৌদি সরকারি বিবরণে দরজার পর্দায় ক্যালিগ্রাফি ও সোনালি অলংকরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর আকার, কাপড়ের প্রস্তুতি, নকশা এবং গিলাপের সঙ্গে সংযুক্ত করার পদ্ধতি আলাদাভাবে পরিকল্পনা করা হয়।

এই পর্দা স্থাপনের জন্য গিলাপের নির্দিষ্ট অংশে কাট তৈরি করে পর্দাটি ভেতর ও বাইরের দিক থেকে সেলাই করে সংযুক্ত করা হয়। ফলে এটি শুধু ঝুলিয়ে দেওয়া কোনো কাপড় নয়; পুরো গিলাপের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত একটি বিশেষ অংশ।

৮. পুরোনো গিলাপের কী হয়?

গিলাপ পরিবর্তনের পর পুরোনো গিলাপের ভাগ্যে কী ঘটে, তা নিয়েও মানুষের কৌতূহল রয়েছে।

সৌদি আরবের সরকারি তথ্যভিত্তিক ওয়েবসাইট সৌদিপিডিয়ার বিবরণ অনুযায়ী, পুরোনো গিলাপের কাপড় বিভিন্ন অংশে ভাগ করা হয়। এসব অংশ জাদুঘর, প্রদর্শনী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপহার হিসেবে দেওয়া হতে পারে।

তবে পুরোনো গিলাপের প্রতিটি অংশ কোথায় যায়, কার কাছে যায় কিংবা কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়—এ বিষয়ে সব বছরের জন্য প্রযোজ্য একটি পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ্য তালিকা পাওয়া যায় না। তাই পুরোনো গিলাপের প্রতিটি অংশ নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কাছে যায় বলে নিশ্চিতভাবে বলা ঠিক হবে না।

এ গিলাপের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্বের কারণে সংরক্ষিত অংশগুলো কাবার ইতিহাস, কারুশিল্প এবং মুসলিম ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবেও বিবেচিত হয়।

৯. গিলাপের পেছনে কাজ করেন বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কারিগরেরা

কাবার গিলাপের মর্যাদা যেমন বিশেষ, এর নির্মাণকাজেও প্রয়োজন হয় বিশেষ দক্ষতার। কাপড় বোনা, সূক্ষ্ম সূচিকর্ম, ক্যালিগ্রাফি, সেলাই ও মান নিয়ন্ত্রণ—প্রতিটি কাজে আলাদা অভিজ্ঞতা দরকার।

২০২৫ সালে সৌদি প্রেস এজেন্সি জানিয়েছিল, গিলাপ পরিবর্তনের কাজে ১৫৪ জন প্রশিক্ষিত সৌদি কারিগর অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের দায়িত্ব ছিল গিলাপের বিভিন্ন অংশ খুলে ফেলা, নতুন কাপড় বসানো এবং প্রতিটি অংশ নিখুঁতভাবে সংযুক্ত করা।

তথ্যসূত্র

১. সৌদি প্রেস এজেন্সি (SPA), Two Holy Mosques Authority Completes Replacement of Holy Kaaba Kiswa, ২৬ জুন ২০২৫।
২. সৌদি প্রেস এজেন্সি (SPA), Ceremony Begins to Replace Kiswa of Holy Kaaba, ২৫ জুন ২০২৫।
৩. সৌদি প্রেস এজেন্সি (SPA), With Skilled Saudi Hands: The Holy Kaaba’s Kiswa Crafted from Silk, Gold, and Silver Threads, ৭ জুলাই ২০২৪।
৪. সৌদিপিডিয়া, Where Is the Kiswa of the Holy Kaaba Made?

এমএজেড
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত