মেহর নিউজের বিশ্লেষণ

ইরানের সঙ্গে সংঘাতকে 'সভ্যতার লড়াইয়ে' রূপ দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতকে সামরিক আগ্রাসন হিসেবে না দেখিয়ে সভ্যতার সংঘাত হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর প্রাচীন পারস্যের গ্রিস অভিযান নিয়ে মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এমন দাবি করা হয়েছে ইরানের সংবাদমাধ্যম মেহর নিউজের এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে।

নিবন্ধে বলা হয়েছে, গ্রিসের এথেন্সে অ্যাক্রোপলিস পরিদর্শনের সময় রুবিও খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮০ সালে পারস্যের রাজা জার্কসিসের গ্রিস অভিযান প্রসঙ্গ টানেন। ওই অভিযানের সময় পবিত্র স্থাপনাগুলোতে আগুন দেওয়া এবং মন্দির লুটের অভিযোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। ইরানি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইতিহাসের এই ঘটনা সামনে এনে ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে বর্তমান সংঘাতকে বৃহত্তর সভ্যতাগত বিরোধ হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে।

নিবন্ধটির দাবি, ইরানের সঙ্গে সংঘাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমা শক্তির প্রভাব তুলে ধরা এবং ইরানকে যুদ্ধপ্রবণ রাষ্ট্র হিসেবে চিত্রিত করার মাধ্যমে ওয়াশিংটন সংঘাতের একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে চাইছে। বিশ্লেষণটিতে আরও বলা হয়েছে, সভ্যতার সংঘাতের বয়ান যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে যুদ্ধের পক্ষে থাকা গোষ্ঠীগুলোর জন্য আদর্শিক যুক্তি তৈরির সুযোগ করে দিতে পারে।

ইরানি নিবন্ধে আরও যুক্তি দেওয়া হয়েছে, সামরিক শক্তি বা রাজনৈতিক কৌশল দিয়ে কোনো সভ্যতার পরিচয় তৈরি করা যায় না। ইতিহাস, সংস্কৃতি, জাতীয় পরিচয় ও সামাজিক সক্ষমতার ভিত্তিতে সভ্যতা গড়ে ওঠে। ইরান, চীন ও মিসরের দীর্ঘ ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করে লেখাটিতে বলা হয়েছে, ইরানও নতুন ইসলামী সভ্যতার ধারণাকে নিজেদের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেছে। ইরানের ঐতিহাসিক পরিচয়কে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করা হলে তা উল্টো দেশটির মানুষের মধ্যে জাতীয় সংহতি জোরদার করতে পারে বলেও দাবি করা হয়েছে।

প্রাচীন পারস্যের গ্রিস অভিযানকে সামনে আনার সমালোচনা করে নিবন্ধটিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব যুদ্ধ ও সামরিক হস্তক্ষেপের ইতিহাসও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে প্রায় আড়াই শতকের ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্র বহু যুদ্ধে জড়িয়েছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্বের ২৫০ বছরের মধ্যে ২৩৩ বছরই দেশটি যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। আদিবাসীদের সঙ্গে সংঘাত, ব্রিটেন, মেক্সিকো ও স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে কোরিয়া, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন সামরিক সম্পৃক্ততার প্রসঙ্গও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিবন্ধটির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে যুদ্ধ ও সামরিক হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ভূমিকার দিকেই ইঙ্গিত করে। বিশ্বব্যাপী প্রভাব ও আধিপত্য ধরে রাখার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সামরিক শক্তি ব্যবহারের প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করেছে লেখাটি। একই সঙ্গে ইরানকে ধ্বংস করা বা দেশটির অস্তিত্বের অবসান ঘটানোর মতো বক্তব্যকে সভ্যতাগত শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ নয়, বরং মার্কিন নীতির পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

রুবিওর বক্তব্যের আরেকটি উদ্দেশ্য হিসেবে ইউরোপীয় দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের পাশে টানার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছে নিবন্ধটি। এতে বলা হয়েছে, প্রাচীন পারস্যের গ্রিস অভিযান সামনে এনে বর্তমান বিরোধকে দুই দেশের মধ্যকার সংঘাতের সীমা ছাড়িয়ে সভ্যতার লড়াই হিসেবে দেখানোর চেষ্টা থাকতে পারে। তবে ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকেরা নিজেদের স্বার্থ ও হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবেন; ওয়াশিংটনের বয়ান গ্রহণ করলেই যে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনুসরণ করবেন, তা নিশ্চিত নয়।

শেষাংশে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধকে কেবল কূটনৈতিক মতপার্থক্য হিসেবে না দেখার আহ্বান জানানো হয়েছে। নিবন্ধটির দাবি, দুই দেশের মধ্যে আদর্শিক ও সভ্যতাগত দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যও সংঘাতের পেছনে ভূমিকা রাখছে। এ কারণে শুধু আলোচনা, নমনীয়তা বা ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে বিরোধের সমাধান সম্ভব, এমন ধারণার ওপর নির্ভর না করে জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মত প্রকাশ করেছে লেখাটি।

উল্লেখ্য, নিবন্ধটি ইরানি সংবাদমাধ্যম মেহর নিউজে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণ। এতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রকৃতি সম্পর্কে যেসব বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, সেগুলো নিবন্ধটির লেখকের বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন; সেগুলোকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। সূত্র: মেহর নিউজ এজেন্সি