মধ্য লন্ডনের এক ব্যস্ত নগরীতে, যেখানে প্রতিদিনের জীবন স্বাভাবিক ছন্দেই এগিয়ে চলে, সেখানেই নীরবে সক্রিয় একটি ছায়া-নেটওয়ার্ক। ব্রিটিশ মন্ত্রীদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে, ইরান সরাসরি লন্ডনকে ব্যবহার করছে পশ্চিমা বিশ্বে গোয়েন্দা তৎপরতা ও প্রভাব বিস্তারের ঘাঁটি হিসেবে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, তেহরান যুক্তরাজ্যের তুলনামূলক ‘সহনশীল পরিবেশ’কে কাজে লাগিয়ে গুপ্তচর নিয়োগ, তথ্য সংগ্রহ ও প্রচারণা চালাচ্ছে। এই তৎপরতার কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় ইংরেজি ভাষার চ্যানেল প্রেস টিভি, যার লন্ডনে একটি স্টুডিও এখনো সক্রিয়।
সাংবাদিকতার আড়ালে গুপ্তচরবৃত্তি
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অভিযোগ, প্রেস টিভি কেবল একটি গণমাধ্যম নয় এটি সম্ভাব্য টার্গেট চিহ্নিত ও নিয়োগের একটি ‘ফ্রন্ট’। সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জনাথন হ্যাকেট বলেন, সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে মানুষের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ স্থাপন করা যায়, যা গোয়েন্দা তৎপরতার জন্য আদর্শ আড়াল।
তার ভাষায়, প্রথমে সম্ভাব্য ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়, তারপর ধীরে ধীরে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়। পরবর্তীতে তাদের আরও অভিজ্ঞ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
‘টার্গেট লিস্ট’ বিতর্ক
প্রেস টিভির কিছু অনুষ্ঠান নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ব্রিটেনের ইহুদি নিরাপত্তা সংস্থা কমিউনিটি সিকিউরিটি ট্রাস্ট। তাদের দাবি, চ্যানেলটির কিছু কনটেন্ট কার্যত ইহুদি সংগঠন, স্কুল ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের একটি ‘টার্গেট তালিকা’ তৈরি করছে যা সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সম্প্রতি উত্তর লন্ডনে একটি সিনাগগের বাইরে ইহুদি দাতব্য সংস্থার চারটি অ্যাম্বুলেন্সে আগুন দেওয়ার ঘটনায় এই আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে এবং এর পেছনে ইরানের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নজরদারি ও গ্রেপ্তার
এই মাসের শুরুতেই দুই ইরানি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, লন্ডনে অবস্থিত ইসরায়েলি দূতাবাস ও একটি ঐতিহাসিক সিনাগগে ‘শত্রুতামূলক নজরদারি’ চালানো।
ইরান দীর্ঘদিন ধরেই ব্রিটেনে ইহুদি সম্প্রদায়, ইসরায়েলি স্বার্থ এবং ভিন্নমতাবলম্বী ইরানিদের লক্ষ্যবস্তু করে আসছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা অপরাধী চক্রকে ব্যবহার করে এই কাজগুলো সম্পন্ন করে।
অতীতের নজির: বড় ধাক্কা যুক্তরাষ্ট্রে
এই ধরনের নিয়োগ তৎপরতার একটি আলোচিত উদাহরণ মনিকা উইট। মার্কিন বিমানবাহিনীর সাবেক এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা গোপন তথ্যের প্রবেশাধিকার রাখতেন। তাকে ধাপে ধাপে প্রভাবিত করে শেষ পর্যন্ত ইরানের পক্ষে কাজ করতে রাজি করানো হয়।
এটি ছিল ইরানের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি, যা পশ্চিমা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
নিষেধাজ্ঞা, তবুও সক্রিয়
প্রেস টিভি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় নিষিদ্ধ বা সীমিত। ২০১২ সালে যুক্তরাজ্যেও তাদের সম্প্রচার লাইসেন্স বাতিল করা হয়। তবুও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে, যেখানে মিলিয়নের বেশি অনুসারী আছে।
এই ‘গ্রে জোন’-এই তাদের কার্যক্রম সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করছে, আইন ভাঙছে না, কিন্তু প্রভাব বিস্তার করছে।
সরকারের অবস্থান
ব্রিটিশ সরকার বলছে, তারা ইরান থেকে আসা হুমকি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন। দেশটির স্বার্থ ও নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষাই তাদের প্রথম অগ্রাধিকার। ইতোমধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে একাধিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ