পশ্চিম ইউরোপজুড়ে তীব্র দাবদাহ আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। একের পর এক দেশে ভাঙছে তাপমাত্রার রেকর্ড, বিপর্যস্ত হচ্ছে বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যবস্থা, বন্ধ হচ্ছে স্কুল। ফ্রান্সে চরম গরমের কারণে অন্তত ৬৮ হাজার পরিবার বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, আর দেশটির ইতিহাসে রেকর্ড হয়েছে সর্বোচ্চ জাতীয় গড় তাপমাত্রা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুমণ্ডলের বিশেষ চাপ ও বায়ুপ্রবাহের ধরণ কয়েকদিন ধরে উষ্ণ বায়ুকে একই অঞ্চলে আটকে রাখছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে সেই পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়ে উঠেছে, ফলে প্রতিদিনই বাড়ছে তাপমাত্রার পারদ।
ফ্রান্সের জাতীয় তাপমাত্রা সূচক, দেশের ৩০টি আবহাওয়া কেন্দ্রের দিন ও রাতের গড় তাপমাত্রা, মঙ্গলবার (২৩ জুন) পৌঁছেছে ২৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ১৯৪৭ সালে পরিমাপ শুরু হওয়ার পর যা সর্বোচ্চ।
দাবদাহের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ অবকাঠামোতেও। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ফিনিস্তের বিভাগে একটি ট্রান্সফরমারে তাপজনিত ত্রুটির কারণে প্রায় ৬৮ হাজার পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। মঙ্গলবার রাত নাগাদ দেশজুড়ে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন গ্রাহকের সংখ্যা এক লাখ ছয় হাজার ছাড়িয়ে যায়।
চরম গরমে হিমশিম খাচ্ছে ফরাসি জনগণও। যেসব ভবন কখনো এত তাপমাত্রা মোকাবিলার জন্য নির্মিত হয়নি, সেসব জায়গায় হু হু করে বাড়ছে পাখা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের বিক্রি।
বর্তমানে ফ্রান্সের ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ চরম তাপপ্রবাহের আওতায় রয়েছে। বুধবার (২৪ জুন) ব্রিটানি থেকে প্যারিস এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ৩৯ থেকে ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এই দাবদাহ ইতোমধ্যে প্রাণহানিও ডেকে এনেছে। গরম থেকে বাঁচতে গিয়ে পানিতে নামার সময় ডুবে অন্তত ৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া পার্ক করা গাড়ির ভেতরে তাপদাহে প্রাণ হারিয়েছে দুই শিশু।
যুক্তরাজ্যেও পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। দেশটির আবহাওয়া বিভাগ বুধবার ও বৃহস্পতিবারের জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, জুন মাসের সর্বকালের তাপমাত্রার রেকর্ডও ভেঙে যেতে পারে।
ইংল্যান্ডের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চল এবং ওয়েলসে জারি করা হয়েছে বিরল ‘লাল সতর্কতা’। ২০২২ সালে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার পর এবারই দ্বিতীয়বার এমন সতর্কতা দেওয়া হলো।
দাবদাহের প্রভাবে ইতোমধ্যে শত শত স্কুল বন্ধ হয়েছে, বাতিল করা হয়েছে বহু ট্রেন সার্ভিস। লাল সতর্কতাপ্রবণ এলাকায় একান্ত প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। লন্ডন ও প্যারিসের মধ্যে চলাচলকারী কয়েকটি ট্রেনও বাতিল করেছে ইউরোস্টার।
ইতালির মিলান ও রোমসহ ১৬টি শহরে জারি হয়েছে সর্বোচ্চ তাপপ্রবাহ সতর্কতা। স্পেনে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির ওপরে ওঠার পর হিটস্ট্রোকে মারা গেছেন অন্তত দুই বৃদ্ধ।
তবে দাবদাহের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এখনও বাকি থাকতে পারে। আবহাওয়াবিদদের মতে, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এই তাপপ্রবাহ পূর্ব ইউরোপে ছড়িয়ে পড়বে। পোল্যান্ডে নতুন তাপমাত্রা রেকর্ড গড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, আর ক্রোয়েশিয়া, হাঙ্গেরি, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসেও জারি করা হয়েছে উচ্চমাত্রার সতর্কতা। সূত্র: আলজাজিরা