রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাইবেরিয়া ও দেশটির সুদূর পূর্বাঞ্চলে সাম্প্রতিক তিন সপ্তাহের সফরকে আসন্ন নির্বাচনের আগে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। সফরের শেষ পর্যায়ে বিতর্কিত কুরিল দ্বীপপুঞ্জে পুতিনের প্রথম সফর জাপানের সঙ্গে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনাও তৈরি করেছে।
২৪ জুলাই ইরকুতস্ক থেকে শুরু হওয়া সফরে পুতিন ওমস্ক, ক্রাসনোইয়ার্স্ক, বুরিয়াতিয়ার রাজধানী উলান-উদে এবং নোভোসিবির্স্ক সফর করেন। এরপর তিনি সাখালিনের উপকূলে রুশ প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের সামরিক মহড়া পরিদর্শন করে ইতুরুপ দ্বীপের কুরিলস্ক শহরে যান।
রাশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ আন্দ্রাস তোথ-সিফ্রার মতে, সফরটির মূল লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক বৈধতা ও জনসমর্থন জোরদার করা। তাঁর ভাষ্য, সাইবেরিয়া ও সুদূর পূর্বাঞ্চলের এমন কিছু অঞ্চলকে সফরের আওতায় নেওয়া হয়েছে, যেখানে সামাজিক অসন্তোষের ঝুঁকি রয়েছে এবং ইউক্রেন যুদ্ধে এসব অঞ্চলের মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতিও তুলনামূলক বেশি।
তবে কুরিল দ্বীপপুঞ্জ সফরকে তিনি আলাদা করে দেখেছেন। তাঁর মতে, ইতুরুপ সফরটি মূলত শক্তি প্রদর্শনের একটি পদক্ষেপ, যার কূটনৈতিক খরচ তুলনামূলক কম।
রাশিয়ার ফেডারেল কাঠামো নিয়ে গবেষক ইরিনা বুসিগিনার মতে, আগামী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল ইউনাইটেড রাশিয়ার অবস্থান শক্তিশালী করাও সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে। তাঁর ধারণা, সফরের শহরগুলো বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ভোটার সংখ্যা ও নির্বাচনী গুরুত্ব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
বুরিয়াতিয়ায় পুতিনের সফরেও নির্বাচনী ও রাজনৈতিক বার্তার বিষয়টি স্পষ্ট ছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। অঞ্চলটিতে ইউক্রেন যুদ্ধে হতাহতের হার তুলনামূলক বেশি এবং দারিদ্র্য ও বেকারত্বও দীর্ঘদিনের সমস্যা। সেখানে পুতিনের আলোচনায় যুদ্ধের পরিবর্তে নগর উন্নয়ন ও গণপরিবহনের মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
এদিকে পুতিনের সফরের সময় যুদ্ধের সাবেক সেনাসদস্য, শিক্ষার্থী, কারখানার শ্রমিক ও তরুণ বিজ্ঞানীদের সঙ্গে তাঁর ধারাবাহিকভাবে সাক্ষাৎকে পরিকল্পিত জনসংযোগ কর্মসূচি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বুসিগিনা এই আয়োজনকে সাবেক সোভিয়েত নেতা লিওনিদ ব্রেজনেভের আমলের রাজনৈতিক প্রচারের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
অন্যদিকে, সফরের শেষ পর্যায়ে কুরিল দ্বীপপুঞ্জে পুতিনের উপস্থিতি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জাপান। টোকিও দ্বীপগুলোকে নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করে আসছে। ফলে সফরটি রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি মস্কো-টোকিও সম্পর্কেও নতুন উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।
রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এ সময় অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপও সামনে এসেছে। বাশকোর্তোস্তান বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় তেল কোম্পানি বাশনেফতের অবশিষ্ট অংশ রসনেফতের কাছে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যদিকে, দীর্ঘ খরা ও উচ্চ তাপমাত্রায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতির কারণে নোভোসিবির্স্ক ও ওমস্ক অঞ্চলে জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পুতিনের এই সফর একদিকে রাশিয়ার আঞ্চলিক প্রশাসন ও ভোটারদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের যোগাযোগ জোরদারের চেষ্টা, অন্যদিকে আসন্ন নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন দলের প্রতি সমর্থন বাড়ানোর একটি রাজনৈতিক উদ্যোগ। তবে এসব সফর ইউনাইটেড রাশিয়ার ভোটে কতটা বাস্তব প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।