নরওয়ের রাজা হারাল পঞ্চম আর নেই। দীর্ঘ ৩৫ বছর সিংহাসনে থাকার পর শুক্রবার (২৮ আগস্ট) স্থানীয় সময় সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটে অসলো বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে মারা যান তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর।
ইউরোপের সবচেয়ে বয়স্ক জীবিত রাজা ছিলেন হারাল। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নরওয়ের রাজতন্ত্রে একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান হলো। একই সঙ্গে দায়িত্ব নিলেন তাঁর ছেলে ক্রাউন প্রিন্স হাকন, যিনি রাজা হাকন অষ্টম নামে সিংহাসনে বসেছেন।
জীবনের শেষ কয়েক বছর নানা স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগেছেন হারাল্ড। আগস্টের মাঝামাঝি তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। রাজপ্রাসাদ জানিয়েছিল, তিনি হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়ায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরে তাঁর রক্তে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ধরা পড়ে এবং শেষ দিকে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে।
এর আগেও একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ২০২৪ সালে মালয়েশিয়ায় ছুটিতে থাকা অবস্থায় সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং পরে তাঁর শরীরে স্থায়ী পেসমেকার স্থাপন করা হয়।
তবে শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে দীর্ঘদিন দায়িত্ব থেকে পুরোপুরি সরিয়ে রাখতে পারেনি। এমনকি ইউরোপের কয়েকজন বয়স্ক রাজা সিংহাসন ছেড়ে দিলেও হারাল্ড তা করেননি। তিনি বলেছিলেন, রাজা হিসেবে তাঁর শপথ ছিল আজীবনের।
রাজতন্ত্রকে আধুনিক করেছিলেন হারাল্ড
১৯৯১ সালে বাবা রাজা ওলাভ পঞ্চমের মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন হারাল্ড। তখন থেকেই ধীরে ধীরে নরওয়ের রাজপরিবারকে আরও আধুনিক, উন্মুক্ত ও সাধারণ মানুষের কাছাকাছি করে তোলার চেষ্টা করেন তিনি।
নরওয়ের সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে রাজার রাজনৈতিক ক্ষমতা সীমিত। দেশ পরিচালনার মূল ক্ষমতা নির্বাচিত সংসদ ও সরকারের হাতে। ফলে হারালের ভূমিকা ছিল মূলত সাংবিধানিক ও প্রতীকী। কিন্তু জাতীয় সংকটের সময়ে তাঁর বক্তব্য ও উপস্থিতি জনগণের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
২০১১ সালের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর তাঁর মানবিক ও ঐক্যের বার্তা বিশেষভাবে নরওয়েজীয়দের মনে জায়গা করে নেয়। সহনশীলতা, বৈচিত্র্য ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে তাঁর অবস্থান তাঁকে একটি জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে পরিণত করেছিল।
প্রেমের জন্য রাজকীয় রীতির বিরুদ্ধে
হারালের ব্যক্তিজীবনও ছিল ব্যতিক্রমী। তিনি তাঁর স্কুলজীবনের প্রেমিকা সোনজা হারালসেনকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাজপরিবারে সাধারণ পরিবারের কাউকে বিয়ে করার বিষয়টি তখন সহজে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
দীর্ঘ অপেক্ষা ও পারিবারিক আপত্তির পর ১৯৬৮ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। সেই সিদ্ধান্ত রাজপরিবারের প্রচলিত রীতির ক্ষেত্রে ছিল গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। পরে সোনজা রানি হন এবং দুজন দীর্ঘ সময় একসঙ্গে নরওয়ের রাজপরিবারের নেতৃত্ব দেন।
এই সম্পর্কও হারালের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে। রাজকীয় প্রটোকলের বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন ও অনুভূতির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করার যে প্রবণতা তাঁর মধ্যে ছিল, সেটিই তাঁকে অনেকের কাছে অন্যরকম রাজা করে তুলেছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিও ছিল তাঁর জীবনে
১৯৩৭ সালে জন্ম নেওয়া হারালের শৈশব কেটেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অস্থির সময়ে। নাৎসি জার্মানি নরওয়ে দখল করার পর রাজপরিবারকে দেশ ছাড়তে হয়। হারাল ও তাঁর পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন, আর তাঁর বাবা ও দাদা ব্রিটেনে নির্বাসনে ছিলেন। যুদ্ধ শেষে তিনি নরওয়েতে ফিরে আসেন।
সিংহাসনে হাকন
হারালের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর ছেলে হাকন সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী রাজা হয়েছেন। তিনি হাকন অষ্টম নাম গ্রহণ করেছেন। তাঁর মেয়ে ইনগ্রিড আলেকজান্দ্রা এখন ক্রাউন প্রিন্সেস হিসেবে উত্তরাধিকারক্রমে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে এসেছেন।