রাশিয়ার রাতভর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইউক্রেনের অন্তত ছয় লাখ মানুষ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দেশটির রাজধানী কিয়েভ ও আশপাশের অঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ শহরের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার দাবি জানানোর পরও এই হামলার ঘটনা ঘটল। কিয়েভে হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের ব্যাপক হামলার লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত যোগাযোগ ও জ্বালানি স্থাপনাগুলো। অন্যদিকে, ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর দাবি, রাতভর দেশটির ভূখণ্ডে ৩৯টি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১২৮টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে রাশিয়া। এর মধ্যে চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১১৫টি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে তারা।
এ নিয়ে টানা দ্বিতীয় রাতের মতো রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হলো কিয়েভ। ইউক্রেনের রাজধানীতে গত দুই রাতেই কোনো আগাম সতর্কসংকেত বা বিমান হামলার সাইরেন বাজার আগেই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রুশ ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা, নাগরিকদের সতর্ক করা এবং সেগুলো প্রতিহত করার চেষ্টা চালাতে ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের উপগ্রহভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে।
স্টারলিংকে গতি সীমা, ইউক্রেনের যুদ্ধ অভিযান ব্যাহত
রুশ হামলার পাশাপাশি ইউক্রেনের সামরিক অভিযানে নতুন জটিলতা তৈরি করেছে স্টারলিংক উপগ্রহভিত্তিক যোগাযোগব্যবহারে গতিসীমা আরোপের ঘটনা। ইলন মাস্কের মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স পরিচালিত এই যোগাযোগব্যবস্থায় বিধিনিষেধের কারণে সম্মুখযুদ্ধের এলাকায় ইউক্রেনীয় বাহিনীর বেশ কয়েকটি অভিযান ব্যাহত হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলেনস্কির এক উপদেষ্টা।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে সেরহি বেস্ক্রেস্তনভ বলেন, স্টারলিংক টার্মিনালগুলোর ওপর রাতারাতি গতিসীমা আরোপ করা হয়েছে। ঘণ্টায় ১০০ মাইল বা প্রায় ১৬০ কিলোমিটার গতির সীমা নির্ধারণের কারণে ইউক্রেনীয় সেনাদের একাধিক অভিযান ব্যাহত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, সেনাদের আগে থেকে এ বিষয়ে জানানো হয়নি। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে এই পদক্ষেপের সম্পর্ক থাকতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পরবর্তী আরেকটি পোস্টে বেস্ক্রেস্তনভ বলেন, রাশিয়ার নতুন ধরনের জেটচালিত ড্রোন প্রতিহত করতে আকাশে পাঠানো প্রতিরোধী ড্রোনগুলোর কার্যক্রম পরিচালনায় স্টারলিংক সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থাগুলোর একটি। ফলে এই যোগাযোগব্যবস্থায় বিধিনিষেধ ইউক্রেনের ড্রোন পরিচালনা ও আকাশ প্রতিরক্ষার সক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রও জানিয়েছে, ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটারের বেশি গতির ক্ষেত্রে স্টারলিংক সংযোগে বিধিনিষেধ শনাক্ত করা হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট গতিসীমা যাচাই করা হচ্ছে। ওই সূত্রের ভাষ্য, পরিস্থিতি সামরিক কার্যক্রমকে উল্লেখযোগ্যভাবে জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে রসদ পরিবহন, চালকবিহীন ব্যবস্থা পরিচালনা এবং মাঝারি পাল্লার হামলাসহ বিভিন্ন অভিযানে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সমস্যাটির মূল কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে।
ইউক্রেনের সেনাদের ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া এবং রুশ লক্ষ্যবস্তুর দিকে অগ্রসর হওয়া ড্রোন নিয়ন্ত্রণে স্টারলিংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে রুশ বাহিনীর স্টারলিংক ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মাস্ক। ওই পদক্ষেপে ইউক্রেনে রাশিয়ার অগ্রযাত্রা ব্যাহত হয়েছিল এবং রুশ সামরিক কমান্ডারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক গতিসীমা আরোপের বিষয়ে স্পেসএক্স এখনো কোনো মন্তব্য করেনি।
যুদ্ধবিরতি নিয়ে ট্রাম্প-জেলেনস্কির বক্তব্যে অমিল
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে বলে রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, উভয় পক্ষ এতে সম্মত হয়েছে এবং অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। তবে এর পরও ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় রুশ হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জেলেনস্কি জানিয়েছেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, রাশিয়াও একই ধরনের পদক্ষেপ নিলে তার দেশ রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও অন্যান্য জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ করতে প্রস্তুত। তবে যুদ্ধবিরতির শর্ত ও বাস্তবায়ন নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থানে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে।
জেলেনস্কির দাবি, ট্রাম্পের ঘোষিত জ্বালানি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হলে যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান সীমিত করার হুমকি দিয়েছিল। তবে মঙ্গলবার ট্রাম্প অস্বীকার করেন যে ওয়াশিংটন ইউক্রেনের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি বন্ধ রেখেছে।
এদিকে ইউক্রেনে রুশ হামলার জবাবে রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলেও ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে মস্কো। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, রাতভর দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ৯০২টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। এসব অঞ্চলের মধ্যে রাজধানী মস্কো ও ২০১৪ সালে রাশিয়ার দখলে যাওয়া ক্রিমিয়াও রয়েছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য বুধবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সঙ্গে ডাউনিং স্ট্রিটে বৈঠক করার কথা রয়েছে জেলেনস্কির। কিয়েভের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় সরবরাহ ত্বরান্বিত করা নিয়ে সেখানে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। টানা দুই রাতের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং আগাম সতর্কসংকেত ছাড়াই রাজধানীতে আঘাত হানার ঘটনাগুলো ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাকে আরও সামনে এনেছে।
অন্যদিকে, রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধবিরতির ফলে পাওয়া সাময়িক অবকাশের যোগ্য নয়। তার দাবি, যুদ্ধবিরতি হলে ইউরোপ ইউক্রেনকে আরও অস্ত্র সরবরাহ করার সুযোগ পাবে, যা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে দেশটিকে সক্ষম করবে।
ফলে একদিকে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের যুদ্ধবিরতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির অমিল দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে স্টারলিংক সংযোগে বিধিনিষেধ ইউক্রেনের সামরিক অভিযানকে আরও জটিল করে তুলছে। বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলা, যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং যুদ্ধবিরতি নিয়ে মতবিরোধ, সব মিলিয়ে দেশটির সামরিক ও বেসামরিক পরিস্থিতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। সূত্র: বিবিসি