এনডিটিভির প্রতিবেদন

চীনের দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ, নেপথ্যে ভারতের চাপ?

তিস্তা প্রকল্প ও মোংলা বন্দরকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘোষণাগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানিয়েছেন, ভারত চাইলে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোরেও অংশ নিতে পারে। তার এই বক্তব্য একদিকে নয়াদিল্লির জন্য সম্ভাবনার দরজা খোলা রাখছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে চীনের অবস্থানও স্পষ্ট করছে।

ইয়াও ওয়েন বলেন, প্রায় ১৫ বছর আগে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (BCIM) অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল এবং কিছু অগ্রগতিও হয়েছিল। তবে বিভিন্ন কারণে চীন প্রত্যাশিত ফল পায়নি।

ভারত এই করিডোরে যোগ দিতে পারবে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভারত আগ্রহী হলে করিডোরটি তাদের জন্যও উন্মুক্ত। শুধু ভারত নয়, অন্য যেকোনো দেশ প্রস্তুত থাকলে চীন তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে আগ্রহী। তবে একই সঙ্গে তিনি জানান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে নিয়ে নতুন অর্থনৈতিক করিডোর এগিয়ে নিতে চীন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

তিস্তা প্রকল্প প্রসঙ্গে চীনের রাষ্ট্রদূত বলেন, আগের সমঝোতা ছিল একটি চীনা কোম্পানি ও বাংলাদেশের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। এখন সরকার-পর্যায়ে সহযোগিতার মাধ্যমে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এজন্য চীনা কোম্পানিগুলো জরিপ পরিচালনা করবে এবং চীনা সরকার বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে এই কাজ সম্পন্ন করবে।

অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তিস্তা-সংক্রান্ত উন্নয়ন সহযোগিতা দুই দেশের পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং বিষয়টি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয়। তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারতের অবস্থান বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতের সব অগ্রগতি বিবেচনায় রাখা হবে।

যুদ্ধবিমান সংগ্রহ, অর্থনৈতিক করিডোর এবং নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা নয়াদিল্লির জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

শি জিনপিং–তারেক রহমান বৈঠক

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান "নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের চীন-বাংলাদেশ সম্প্রদায়" গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন। এর মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বৈঠকের পর শি জিনপিং বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি যেভাবেই পরিবর্তিত হোক না কেন, চীন বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে এবং বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী ও অংশীদার হিসেবে পাশে থাকবে।

ভারতের জন্য কী বার্তা?

বিশ্লেষকদের মতে, শি জিনপিংয়ের এই বক্তব্য বিশেষ করে তিস্তা অঞ্চলে বাংলাদেশের ভেতরে চীনের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির ইঙ্গিত বহন করে, যা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বার্তা।

তাদের মতে, বাংলাদেশের চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেও, ভারতের সঙ্গে আলোচনায় আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরির কৌশল হিসেবেও এটিকে দেখা হচ্ছে।

এ অবস্থার পেছনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, ভারতবিরোধী বক্তব্যের জোরালো উপস্থিতি এবং পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধজনিত জ্বালানি সংকটের সময়ে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের ধারাবাহিক সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হয়।

তারেক রহমানের সফরের সময় চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর (CMBC) গঠনের প্রস্তাবও দেয়। এই উদ্যোগ বেইজিংকে বঙ্গোপসাগরে নতুন প্রবেশপথের সুযোগ দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ভারতের নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকবে।

বর্তমান CMBC প্রস্তাবটি মূলত ১৯৯০-এর দশকে প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (BCIM) করিডোরের পুনর্গঠিত রূপ। সেই পরিকল্পনায় কুনমিং থেকে মান্দালয়, ঢাকা হয়ে কলকাতা পর্যন্ত সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্য ছিল।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তারেক রহমান ও শি জিনপিং বৃহত্তর আঞ্চলিক সংযোগ নিশ্চিত করতে এই করিডোর এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা করেছেন।

মিয়ানমারে ভারত ও চীনের পৃথক কৌশলগত উপস্থিতি রয়েছে। সিত্তে ও কিয়াউকফিউ-এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে উভয় দেশই সংযোগ ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করছে।

ভারতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অন্যতম ভিত্তি কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্প। এই প্রকল্পের মাধ্যমে কলকাতা থেকে সমুদ্রপথে সিত্তে, এরপর কালাদান নদীপথে পালেতওয়া এবং সড়কপথে ভারতের মিজোরামের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হবে। এর ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পরিবহন সময় ও ব্যয় কমবে এবং শিলিগুড়ি করিডোরের ওপর নির্ভরতা হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে সিত্তের কাছাকাছি কিয়াউকফিউতে চীনের কৌশলগত উপস্থিতি রয়েছে। রাখাইন রাজ্যের এই উপকূলীয় শহরটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানকার গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) বঙ্গোপসাগরের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরে চীনের প্রবেশাধিকার সহজ করবে এবং মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করবে।