পাঁচ বছর পর তালেবানের সামনে সশস্ত্র বিরোধীদের চাপ

আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পূর্ণ হলেও দেশটিতে সশস্ত্র বিরোধিতা পুরোপুরি থামেনি। বিভিন্ন নামে ও নেতৃত্বে একাধিক গোষ্ঠী বিভিন্ন প্রদেশে সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে হামলার দাবি করছে। তবে জাতিসংঘের মতে, এসব গোষ্ঠী এখনো আফগানিস্তানের ভূখণ্ডে তালেবানের নিয়ন্ত্রণের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারেনি এবং কোনো নির্দিষ্ট এলাকাও তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।

২০২১ সালের আগস্টে কাবুল পতনের পর থেকেই তালেবানবিরোধী একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এসব গোষ্ঠীর অনলাইন তৎপরতাও দৃশ্যত বেড়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বিরোধীদের একাধিক ফ্রন্ট কি সত্যিই সশস্ত্র প্রতিরোধের বিস্তার নির্দেশ করছে, নাকি এটি মূলত নেতৃত্ব ও সংগঠনের বিভক্তির প্রতিফলন?

সম্প্রতি উত্তর আফগানিস্তানের বাদাখশান প্রদেশে নতুন করে সংঘর্ষ সেই প্রশ্নকে আরও সামনে এনেছে। আফগানিস্তান ফ্রিডম ফ্রন্ট দাবি করেছে, তারা জেবাক জেলায় তালেবান অবস্থানে হামলা চালিয়ে কয়েকটি সামরিক অবস্থান দখল এবং তালেবান সদস্যদের হতাহত করেছে। তালেবানও পাল্টা দাবি করেছে, তারা হামলা প্রতিহত করে হামলাকারীদের কয়েকজনকে হত্যা করেছে।

সংঘর্ষ কয়েক দিন ধরে চলা এবং পরে এর তীব্রতা কমে আসা বিরোধীদের সাম্প্রতিক তৎপরতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। কারণ, সাধারণত তালেবানবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর অভিযান বিচ্ছিন্ন ও সীমিত পরিসরেই থাকে।

তবে তালেবানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিরোধিতার সবচেয়ে বড় সংগঠনগুলোর একটি হলো ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট। কাবুল পতনের পর সাবেক সরকারের সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর শত শত সদস্য অস্ত্র ও সরঞ্জাম নিয়ে কাবুলের উত্তরে পাঞ্জশিরে জড়ো হয়ে এই প্রতিরোধে যোগ দেন।

তালেবান বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রাদেশিক রাজধানী ও পাঞ্জশিরের অধিকাংশ এলাকা দখলে নেওয়ার পর সেখানকার লড়াই সীমিত অভিযান ও বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষে পরিণত হয়।

নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষক করিম আমিনির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের পর সাবেক সরকারের রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিরা তালেবানের ওপর চাপ তৈরির উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সশস্ত্র ফ্রন্ট গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এসব উদ্যোগকে মাঠপর্যায়ে প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত করা সম্ভব হয়নি।

এর একটি কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, বেশির ভাগ গোষ্ঠী আফগানিস্তানের বাইরে থেকে গড়ে ওঠায় দেশটির ভেতরে শক্তিশালী সাংগঠনিক উপস্থিতি ও সামাজিক ভিত্তি তৈরি করতে পারেনি।

দীর্ঘ চার দশকের সংঘাতে ক্লান্ত আফগান সমাজও নতুন করে সশস্ত্র সংঘাতে জড়াতে আগ্রহী নয় বলে মনে করেন আমিনি। তাঁর মতে, তালেবানের বিরুদ্ধে কেবল সশস্ত্র সংঘাতের ওপর নির্ভর করা এসব গোষ্ঠীর কৌশল আফগান জনগণের যুদ্ধক্লান্ত বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়েছে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকটি বিরোধী গোষ্ঠী আফগান সমাজের পরিবর্তিত বাস্তবতাও বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা সশস্ত্র বিরোধিতাকে সাবেক সরকারের রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তরাধিকার হিসেবে দেখেছে এবং বিদেশ থেকে সেটিকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আফগান জনগণের বর্তমান অগ্রাধিকার ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে তাদের আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরির চেষ্টা তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিল।

ফলে এসব গোষ্ঠীর সামনে এখন শুধু বিচ্ছিন্ন হামলা চালিয়ে যাওয়ার প্রশ্ন নয়; বরং দেশটির জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার, স্থানীয় সামাজিক ভিত্তি তৈরি এবং একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি উপস্থাপনের চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

জাতিসংঘের মূল্যায়নও বলছে, তালেবানবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় থাকলেও তারা এখনো তালেবানের ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারেনি। কোনো নির্দিষ্ট এলাকাও তাদের স্থায়ী নিয়ন্ত্রণে নেই।

তাই পাঁচ বছর পর তালেবানের সামনে সশস্ত্র বিরোধিতার প্রশ্নটি আপাতত বড় আকারের ভূখণ্ডগত যুদ্ধের চেয়ে বেশি হয়ে উঠেছে বিচ্ছিন্ন হামলা, নতুন নতুন গোষ্ঠীর আবির্ভাব এবং তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার সমস্যা। বাদাখশানের সাম্প্রতিক সংঘর্ষ অবশ্য দেখিয়ে দিয়েছে, তালেবানবিরোধী সশস্ত্র তৎপরতা পুরোপুরি নিঃশেষ হয়নি। সূত্র: আলজাজিরা