দুই দিনের ব্যবধানে পশ্চিমবঙ্গের দুটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি নতুন করে সামনে এনেছে হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন। ঘুমন্ত অবস্থায় আগুন লাগলে অতিথিদের বের হওয়ার সুযোগ কতটা থাকে, জরুরি বহির্গমন পথ কতটা কার্যকর এবং পুরোনো ভবনগুলোতে বৈদ্যুতিক ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা নিরাপদ—এসব প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ।
হোটেল মানেই ভ্রমণকারীর কাছে সাময়িক আশ্রয়, নিরাপদ ঘুম আর কিছুটা স্বস্তি। কিন্তু সেই আশ্রয়ই যদি রাতের আঁধারে পরিণত হয় প্রাণঘাতী ফাঁদে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক দুটি হোটেল অগ্নিকাণ্ড সেই প্রশ্নটিই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
কলকাতার ব্যস্ত নিউ মার্কেট এলাকার ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে বুধবার ভোররাতে একটি হোটেলে ভয়াবহ আগুনে শিশুসহ অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তারা চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়েছিলেন।
এর মাত্র দুই দিন আগে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার তারাপীঠে আরেকটি হোটেলে আগুনে অন্তত আটজন নিহত হন। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি হোটেলে বড় ধরনের প্রাণহানি নিঃসন্দেহে হোটেলগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
কলকাতার ঘটনার ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, হোটেলের তৃতীয় তলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। একটি এয়ার কন্ডিশনার বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হলেও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটিকে চূড়ান্ত কারণ বলা যাচ্ছে না।
এখানেই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় রয়েছে। কোনো ভবনে আগুন লাগার কারণ এবং আগুনে ব্যাপক প্রাণহানির কারণ এক বিষয় নয়।
একটি ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ, এসি, রান্নাঘর কিংবা অন্য কোনো উৎস থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। কিন্তু সেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়া, ধোঁয়ায় পুরো ভবন ভরে যাওয়া এবং অতিথিরা বের হতে না পারার পেছনে ভবনের নকশা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই তদন্তে শুধু ‘আগুন কোথা থেকে লাগল’—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই হবে না। জানতে হবে, আগুন লাগার পর মানুষ কেন নিরাপদে বের হতে পারলেন না।
কলকাতার অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধারকাজে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি ছিল ঘন ধোঁয়া। একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রচণ্ড ধোঁয়ার কারণে দমকলকর্মীদের সিঁড়ি দিয়ে ওপরের তলায় পৌঁছাতে সমস্যা হয়েছে।
হোটেলে আগুন লাগলে অনেক মানুষ আগুনের শিখার চেয়ে ধোঁয়ার কারণে বেশি বিপদের মধ্যে পড়েন। বিশেষ করে গভীর রাতে অধিকাংশ অতিথি ঘুমিয়ে থাকেন। ঘুম থেকে জেগে পরিস্থিতি বুঝে বের হওয়ার জন্য সময়ও খুব কম থাকে।
একটি কক্ষে আগুন লাগার পর যদি ধোঁয়া দ্রুত সিঁড়ি, করিডোর কিংবা অন্যান্য কক্ষে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে বের হওয়ার প্রধান পথটি অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে যেতে পারে।
তখন বিকল্প জরুরি বহির্গমন পথ, অগ্নিনিরাপত্তা দরজা, অ্যালার্ম ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষিত কর্মীদের ভূমিকা জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করতে পারে।
কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকা শহরের অন্যতম ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল। সেখানে পুরোনো ভবন, সরু রাস্তা, ঘনবসতি ও বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক স্থাপনা পাশাপাশি রয়েছে।
এ ধরনের এলাকায় অগ্নিকাণ্ড হলে শুধু ভবনের ভেতরের মানুষই নয়, উদ্ধারকারী দলের জন্যও পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো, ভবনের কাছাকাছি অবস্থান নেওয়া, পর্যাপ্ত পানি পাওয়া এবং মই বা অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহার করার সুযোগ—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কলকাতার এই ঘটনায় খবর পাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফায়ার টেন্ডার ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও ঘন ধোঁয়া উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তোলে।
অর্থাৎ শুধু দ্রুত ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোই যথেষ্ট নয়। ভবনের ভেতরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও এমন হতে হবে, যাতে উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত অতিথিরা নিরাপদে থাকতে পারেন এবং বের হওয়ার সুযোগ পান।
কলকাতার অগ্নিকাণ্ডের মাত্র দুই দিন আগে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার তারাপীঠে হোটেল ‘বিদেশিনী’তে ভয়াবহ আগুন লাগে।
১৭ আগস্ট ভোররাত সাড়ে ৪টার দিকে পাঁচতলা হোটেলটির নিচতলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। তখন অধিকাংশ অতিথি ঘুমিয়ে ছিলেন।
আগুনে অন্তত আটজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে মেঘালয়ের একটি পরিবারের পাঁচ সদস্য ছিলেন। পরিবারের দুই শিশুও এই ঘটনায় প্রাণ হারায়।
পরিবারটি হোটেলের ওপরের তলায় অবস্থান করছিল। আগুনের খবর পেয়ে তারা শিশুদের নিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করলেও নিচে নামার সময় আগুনের মুখে পড়ে।
ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, হোটেলে আগুন লাগার সময় শুধু আগুন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকলেই হয় না। ভবনের ওপরের তলায় থাকা অতিথিদের দ্রুত ও নিরাপদে বের হওয়ার ব্যবস্থাও থাকতে হয়।
পরপর দুটি অগ্নিকাণ্ডের পর স্বাভাবিকভাবেই কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে।
হোটেল ভবনের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা কতটা নিরাপদ?
হোটেলে আগুন লাগলে অতিথিরা সাধারণত পরিচিত সিঁড়ি বা লিফটের দিকে ছুটতে পারেন। কিন্তু আগুনের সময় লিফট ব্যবহার বিপজ্জনক হতে পারে এবং ধোঁয়ায় সিঁড়িও অচল হয়ে যেতে পারে। তাই বিকল্প নিরাপদ পথ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম কি কার্যকর ছিল?
ফায়ার এক্সটিংগুইশার, অ্যালার্ম, ধোঁয়া শনাক্তকারী যন্ত্র, জরুরি আলো ও অন্যান্য সরঞ্জাম শুধু ভবনে থাকলেই হবে না—সেগুলো সচল এবং নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
কর্মীরা কি জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রশিক্ষিত?
আগুন লাগার পর আতঙ্কিত অতিথিদের দ্রুত নির্দেশনা দেওয়া, শিশু ও বয়স্কদের নিরাপদে বের করে আনা এবং ফায়ার সার্ভিসকে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া—এসব কাজে প্রশিক্ষিত হোটেল কর্মীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
কলকাতা বাংলাদেশিদের অন্যতম জনপ্রিয় চিকিৎসা ও ভ্রমণ গন্তব্য। ফলে হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশে কিংবা দেশের বাইরে কোনো হোটেলে উঠলে শুধু কক্ষের সৌন্দর্য, ভাড়া কিংবা অবস্থান দেখা যথেষ্ট নয়। জরুরি বহির্গমন পথ কোথায়, সিঁড়ি কোথায়, ফায়ার অ্যালার্ম আছে কি না—এসব বিষয়ও খেয়াল করা উচিত।