আফগান তালেবানের ছোড়া আটটি ড্রোন বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) পাকিস্তানের আকাশসীমায় ঢুকে পড়ার পরই সেগুলো ভূপাতিত করেছে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী। তোরখাম সীমান্ত ও কোহাটের কাছাকাছি এলাকায় এই ড্রোনগুলো শনাক্ত করে গুলি করে নামানো হয়, নিরাপত্তা সূত্রগুলো এমনটাই জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্যমতে, পাকিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এই ড্রোনগুলো আটকে দিয়েছে, যেগুলোকে তারা ‘সক্রিয় ও সতর্ক’ বলে বর্ণনা করেছে। নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে বলা হয়, ‘সশস্ত্র বাহিনী এবং পাকিস্তান বিমানবাহিনীর 'শাহীন'রা পেশাদারিত্বের সঙ্গে আফগান তালেবান সরকারের কাপুরুষোচিত প্রচেষ্টা-জনবহুল এলাকা লক্ষ্য করে হামলার-নস্যাৎ করে দিয়েছে।’
সূত্র জানায়, আটটি ড্রোনের মধ্যে চারটি তোরখাম সীমান্ত-সংলগ্ন এলাকায় এবং বাকি চারটি কোহাটের কাছে ভূপাতিত করা হয়েছে।
এর আগে নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছিল, কোহাট শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে ‘সফট স্কিল’ পদ্ধতি প্রয়োগ করে দুটি ‘নিম্নমানের’ ড্রোন নামিয়ে আনা হয়েছিল। তারা আরও বলে, সশস্ত্র বাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘খারজিস্তান থেকে আসা সব ধরনের হুমকির’ বিরুদ্ধে চব্বিশ ঘণ্টাই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
নিরাপত্তা সূত্র বলছে, ‘এই অনুপ্রবেশ আফগান তালেবান সরকারের সন্ত্রাসীদের প্রত্যক্ষ মদদ ও পৃষ্ঠপোষকতার আরেকটি প্রমাণ।’
পরবর্তীতে সূত্র জানায়, ধ্বংস হওয়া ড্রোনগুলোর ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারের কাজ চলছে। গতকাল রাতে কুররম সেক্টরে গোলাগুলি এবং বুধবারের এই ড্রোন অনুপ্রবেশ-দুটি ঘটনাই আফগান তালেবানের ‘আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলার’ প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেছে নিরাপত্তা সূত্র।
খাইবার পাখতুনখোয়ায় সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলার জবাবে সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানের চালানো ‘সুপরিকল্পিত’ বিমান হামলার দুই দিন পর ঘটল এই ঘটনা। তথ্যমন্ত্রণালয়ের সোমবারের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ওই হামলায় ২৮ জনের বেশি সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। মন্ত্রণালয় তখন বলেছিল, ‘আফগানিস্তান এখনো সন্ত্রাসবাদের একটি কেন্দ্র হয়ে থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয়, এবং স্পষ্ট করে জানায় যে ‘পাকিস্তানের প্রতি হুমকি আফগানিস্তান থেকেই আসছে।’
বিমান হামলার আগে, ২০ সেপ্টেম্বর খাইবার পাখতুনখোয়ার কোহাট ও হাঙ্গু জেলায় সন্ত্রাসীদের একটি দলের বিরুদ্ধে ‘সুপরিকল্পিত গোয়েন্দা-ভিত্তিক স্থল অভিযান’ চালায় নিরাপত্তা বাহিনী, বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। ওই অভিযানে নয়জন সন্ত্রাসী নিহত হয়।
উল্লেখ্য, খাইবার পাখতুনখোয়ার কোহাটের পুরনো পুলিশ লাইনসে এক বড় ধরনের হামলায় ২৩ জনের প্রাণহানি ঘটে এবং আহত হন প্রায় ১০০ জন। এরপর এলাকা পরিষ্কার করতে রাতভর চালানো এক অভিযানে আটজন সন্ত্রাসী নিহত হয়।
এ ছাড়া গত ২০ সেপ্টেম্বর হাঙ্গুতে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি বহর ও সশস্ত্র জঙ্গিদের মধ্যে গোলাগুলিতে দুই কর্মকর্তাসহ ছয়জন শহীদ হন এবং আটজন সন্ত্রাসী নিহত হয়, সেনাবাহিনীর গণমাধ্যম শাখা এ তথ্য জানিয়েছে।
গত জুলাই মাসে আফগান তালেবান সরকার বেলুচিস্তান সীমান্ত দিয়ে চারটি নিম্নমানের ড্রোন পাঠিয়েছিল, যেগুলো নিরাপত্তা বাহিনী ভূপাতিত করে। এর আগে জুন মাসেও কিলা আবদুল্লাহ ও চাগাই জেলায় দুটি ড্রোন গুলি করে নামানো হয়েছিল।
পাক-আফগান সম্পর্কে টানাপোড়েন
ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যে সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তপ্ত, গত এক বছরে সীমান্তে একের পর এক সংঘর্ষ এই টানাপোড়েনকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
নিষিদ্ধ টিটিপির সঙ্গে যুক্ত সন্ত্রাসী আস্তানাগুলো গুঁড়িয়ে দিতে কাবুলের তালেবান প্রশাসনকে বারবার আহ্বান জানিয়ে আসছে ইসলামাবাদ, কারণ এসব আস্তানা থেকেই পাকিস্তানে হামলা চালানো হয়। কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, এসব আহ্বানে এখনো কোনো সাড়া মেলেনি।
এর একদিন আগে উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) এক বৈঠকে বক্তব্য রাখেন, যেখানে তিনি প্রতিবেশী দেশ বিশেষ করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে আফগান ভূখণ্ডের ব্যবহার বন্ধে সুনির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য পদক্ষেপের আহ্বান জানান।
দার বলেন, আফগানিস্তানে আড়াই ডজনের বেশি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উপস্থিতি নিয়ে পাকিস্তান ‘গুরুতরভাবে উদ্বিগ্ন, কারণ এসব গোষ্ঠী আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি-নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত সপ্তাহে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকেও পাকিস্তান জানিয়েছিল, প্রয়োজন পড়লে আন্তর্জাতিক আইন মেনে আত্মরক্ষার্থে আফগানিস্তান থেকে আসা সন্ত্রাসী হুমকির জবাব দেবে তারা।
চলতি মাসের শুরুতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (এফও) জানিয়েছিল, কাবুলের সঙ্গে সম্পর্কের প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করছে আফগান ভূখণ্ডে সক্রিয় তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তালেবানের সুনির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর।
মন্ত্রণালয় আরও স্পষ্ট করে জানায়, চীনের অব্যাহত সম্পৃক্ততাকে ইসলামাবাদ স্বাগত জানালেও, বাইরের এই সহায়তা কখনোই সন্ত্রাসী অবকাঠামোর বিরুদ্ধে কাবুলের নিজস্ব পদক্ষেপের বিকল্প হতে পারে না।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নির্দেশনায় তৈরি এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে-যা ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৯ জুন পর্যন্ত সময়কাল ধরে তৈরি-বলা হয়েছে, টিটিপিকে আফগান তালেবানের অব্যাহত সমর্থনের কারণেই পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা ও ভয়াবহতা দুটোই বেড়েছে, যদিও গোষ্ঠীটিকে লাগাম পরাতে কাবুল কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়েছে।
প্রতিবেদনে টিটিপি, আল-কায়েদা, ইসলামিক স্টেট-খোরাসান (আইএসআইএল-কে) এবং বালোচ লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) মধ্যে ক্রমবর্ধমান সাংগঠনিক ও সহযোগিতামূলক সম্পর্কের দিকেও ইঙ্গিত করা হয়েছে।
সূত্র: ডন