রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি ও শান্তি চুক্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তিন দফা একটি প্রস্তাব পেশ করেছে ভারত। যুদ্ধ শুরুর পঞ্চম বছরে এসে এই সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা জোরদার করতে চাইছে নতুন দিল্লি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে এনডিটিভি জানিয়েছে, ভারতের এই যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে মূলত জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষা এবং কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
গত মাসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর কিয়েভ সফর করার সময় ইউক্রেন সরকারের কাছে এই যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনাটি আনুষ্ঠানিকভাবে পৌঁছে দেন।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা নিশ্চিত করেছেন যে কিয়েভ ভারতের কাছ থেকে এই ধরনের একটি প্রস্তাব পেয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে পাওয়া চারটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মধ্যে ভারতের প্রস্তাবটিকেই সবচেয়ে "সর্বাঙ্গীন ও বিস্তারিত" বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। ভারতের পাশাপাশি তুরস্ক, মিশর এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেও যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পেয়েছে ইউক্রেন।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, কিয়েভ যুদ্ধবিরতির যেকোনো রূপরেখা বিবেচনা করতে প্রস্তুত, তবে চুক্তিটি কেবল সামরিক অভিযান বন্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; এতে জ্বালানি ও বন্দর অবকাঠামোতে হামলা বন্ধের পাশাপাশি কৃষ্ণসাগরের সার্বিক পরিস্থিতিকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
এর আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে যুদ্ধ বন্ধের "চমৎকার ও গ্রহণযোগ্য কিছু উপায়" রয়েছে। সংঘাত নিরসনে মোদীর নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি এবং আন্তরিক প্রচেষ্টার প্রশংসাও করেন পুতিন।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, ভারতের তিন দফা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার মূল লক্ষ্যগুলো হলো:
- বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর সব ধরনের আক্রমণ বন্ধ করা।
- কৃষ্ণসাগরীয় বন্দরগুলোর মাধ্যমে খাদ্যশস্য ও জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখা।
- এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর সব ধরণের হামলা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা।
অন্যান্য দেশের প্রস্তাবের সাথে ভারতের পরিকল্পনার বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। মিশর ও তুরস্কের প্রস্তাব প্রধানত বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধের মাধ্যমে কৃষ্ণসাগর থেকে খাদ্যশস্য রফতানি সচল রাখার ওপর জোর দিয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব মূলত একটি "জ্বালানি কেন্দ্রিক যুদ্ধবিরতি"-কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু ভারতের প্রস্তাবটি এসব বিষয়কে এক ছাতার নিচে এনে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়েছে।
ভারতের অবস্থান
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানান, ভারত এখন শুধু পরামর্শ দেওয়ার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; বরং শত্রুতা কমাতে মস্কো ও কিয়েভ—উভয় পক্ষের সাথেই বাস্তবসম্মত ও গঠনমূলক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। দিল্লিতে আয়োজিত মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে বক্তৃতা দেওয়ার সময় তিনি নিশ্চিত করেন যে, গত কয়েক মাসে ভারত উভয় দেশের সাথেই একাধিক বৈঠক করেছে এবং কৃষ্ণসাগরে নৌযান চলাচল রক্ষা ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলেছে।
উল্লেখ্য, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই ভারত নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখে আসছে। দেশটি যুদ্ধ থামানোর কথা বারবার বললেও রাশিয়ার সাথে গভীর প্রতিরক্ষা ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কারণে সরাসরি মস্কোর কোনো কঠোর সমালোচনা করেনি।