চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত জিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের রাজধানী উরুমছি। অর্থনীতি, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে শহরটি কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন করেছে। ২০২০ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, উরুমছির জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ লাখ ৫৪ হাজার। চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অভ্যন্তরীণ শহরগুলোর মধ্যে জনসংখ্যার হিসাবে শিয়ানের পরই এর অবস্থান।
তবে উরুমছির গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন কিংবা আধুনিক নগরায়ণে সীমাবদ্ধ নয়। মধ্য এশিয়ার সঙ্গে চীনের ঐতিহাসিক যোগাযোগ, প্রাচীন সিল্ক রোড, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বসতি, সাম্রাজ্য বিস্তার এবং আধুনিক চীনের রাজনৈতিক ইতিহাস, সবকিছুর সঙ্গে শহরটির সম্পর্ক রয়েছে।
নামের পেছনে কী ইতিহাস?
ইতিহাসবিদ হেরল্ড জে. উইয়েন্সের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘উরুমছি’ নামটি ওরাত ভাষার দুটি শব্দ থেকে এসেছে, যার সম্মিলিত অর্থ ‘সুন্দর তৃণভূমি’।
অষ্টাদশ শতকে চিং রাজবংশের শাসনামলে শহরটির ইতিহাসে বড় পরিবর্তন ঘটে। ১৭৫৫ সালে চিং বাহিনী অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরবর্তী সময়ে শহরটি সম্প্রসারণ করে প্রাচীরঘেরা নগর গড়ে তোলা হয়। ১৭৬৩ থেকে ১৭৬৭ সালের মধ্যে নির্মিত ওই শহরের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘দিহুয়া’। চীনা ভাষায় নামটির অর্থ ‘আলোকিত ও সভ্য করে তোলা’।
১৯৫৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি চীনের কমিউনিস্ট পার্টি শহরটির পুরোনো নাম পুনর্বহাল করে। দলটির ব্যাখ্যা ছিল, ‘দিহুয়া’ নামটির মধ্যে জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা বা অবমাননাকর অর্থের ইঙ্গিত রয়েছে।
প্রাচীন বাণিজ্যপথ থেকে আধুনিক নগর
উরুমছির আশপাশের অঞ্চল প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন যাযাবর জনগোষ্ঠীর চলাচল ও বসতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। চীনা ঐতিহাসিক বিবরণে জুশি নামে পরিচিত একটি জনগোষ্ঠীর উল্লেখ রয়েছে, যারা তিয়ানশান পর্বতমালার উত্তর ঢালে বসবাস করত।
৬৪৮ খ্রিষ্টাব্দে তাং রাজবংশের শাসনামলে ‘লুনতাই’ নামে একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কথা ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়। এটি পশ্চিমাঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণের জন্য গঠিত প্রশাসনিক ব্যবস্থার অংশ ছিল। সিল্ক রোডের উত্তরাঞ্চলীয় পথ দিয়ে যাতায়াতকারী বণিকদের কাছ থেকে কর সংগ্রহও করা হতো।
পরবর্তী সময়ে অঞ্চলটি বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির নিয়ন্ত্রণে আসে। তাং রাজবংশের প্রভাব কমে যাওয়ার পর উইঘুর খাগানাত এবং গাওচাং বা কোচো অঞ্চলের শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের কথা ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে মঙ্গোলরাও বৃহত্তর অঞ্চলটিকে ‘বিশবালিক’ নামে অভিহিত করত।
তবে বিভিন্ন শাসনামলের মধ্যবর্তী সময়ে উরুমছি এলাকায় স্থায়ী জনবসতির ধারাবাহিকতা সম্পর্কে ঐতিহাসিক তথ্য সীমিত।
চিং শাসন ও শহরের সম্প্রসারণ
অষ্টাদশ শতকে চিং রাজবংশ জুঙ্গার খানাতের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায়। ১৭৫৫ সালে উরুমছি চিং বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে। জুঙ্গারদের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও জনসংখ্যা হ্রাসের ঘটনা ঘটে; ইতিহাসের বিভিন্ন বিবরণে এ সময়ের সহিংসতার উল্লেখ রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে চিং সরকার এলাকায় সামরিক ছাউনি প্রতিষ্ঠা করে এবং কৃষিকাজের জন্য রাষ্ট্রীয় খামার গড়ে তোলে। মাঞ্চু ও মঙ্গোল সেনাসদস্যদের পাশাপাশি হান চীনা সৈন্যদেরও সেখানে রাখা হয়েছিল।
১৭৬৩ থেকে ১৭৬৭ সালের মধ্যে প্রাচীরঘেরা নতুন শহর গড়ে ওঠে। ১৭৭১ সালে কাছাকাছি আরেকটি নগর স্থাপন করা হয়, যা মাঞ্চু সেনাসদস্যদের আবাসন ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
এভাবে শহরটির বিভিন্ন অংশ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে আলাদা ভূমিকা নিতে শুরু করে। হান চীনা জনগোষ্ঠী এবং গানসু ও শানসি অঞ্চল থেকে আসা হুই মুসলিমদের বসতিও শহরের জনজীবনে বৈচিত্র্য যোগ করে।
সাম্রাজ্যের পতন থেকে আধুনিক চীন
১৯১১ সালে চিং রাজবংশের পতনের পর জিনজিয়াং বিভিন্ন আঞ্চলিক শাসকের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ইয়াং জেংসিন, জিন শুরেন, শেং শিচাই এবং ঝাং ঝিঝং—বিভিন্ন সময়ে উরুমছি থেকে অঞ্চলটির প্রশাসন পরিচালনা করেন।
১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর শহরটির প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়ে। ১৯৬২ সালে ইয়িনিংয়ে চীনা শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ এবং পরবর্তী ‘ই-তা’ ঘটনার পর অঞ্চলটির প্রশাসনিক কেন্দ্র ও শিল্প কার্যক্রমের বড় অংশ উরুমছিতে কেন্দ্রীভূত হয়।
একই সময়ে চীনের পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে রেল যোগাযোগ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ফলে জিনজিয়াংয়ের অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থা চীনের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়।
১৯৭০-এর দশকের শেষদিকে চীনের অর্থনৈতিক নীতিতে পরিবর্তনের পর জিনজিয়াংয়ের তেল ও গ্যাসশিল্পের বিকাশ উরুমছির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জাতিগত উত্তেজনা ও ২০০৯ সালের দাঙ্গা
উরুমছির আধুনিক ইতিহাসে জাতিগত সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উইঘুর ও হান চীনা জনগোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে।
১৯৮৯ সালের মে মাসে শহরটিতে অস্থিরতায় প্রায় ১৫০ জন আহত হন বলে সংকলিত ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে গুলজা ঘটনার পর উরুমছিতে বোমা হামলায় ২০ জন নিহত হন এবং আরও অনেকে আহত হন।
২০০৯ সালের জুলাইয়ে উইঘুর ও হান চীনা জনগোষ্ঠীর মধ্যে বড় ধরনের দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। চীনা সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ওই ঘটনায় ১৯৭ জন নিহত হন। তবে নিহতদের জাতিগত পরিচয় ও সহিংসতার বিভিন্ন দিক নিয়ে মতভেদ রয়েছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে পুলিশি সংঘর্ষ, বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা এবং পরবর্তী সময়ে প্রতিশোধমূলক সহিংসতার বিবরণ উঠে আসে।
এই ঘটনাগুলো জিনজিয়াংয়ে জাতিগত সম্পর্ক, নিরাপত্তা এবং চীনা সরকারের শাসননীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে।
মরুভূমির কাছেও পানির শহর
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকেও উরুমছি ব্যতিক্রমী। শহরটির আশপাশে উত্তর দিকে গুরবানতুংগুত এবং দক্ষিণে তাকলামাকান মরুভূমি রয়েছে। অন্যদিকে তিয়ানশান ও বোগদা পর্বতমালার তুষার ও হিমবাহ থেকে নেমে আসা ছোট ছোট নদী অঞ্চলটিকে পানির জোগান দেয়।
তবে জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই চাহিদা মোকাবিলায় একুশ শতকের প্রথম দশকে ইরটিশ–উরুমছি খাল নির্মাণ করা হয়। এর মাধ্যমে দূরবর্তী জলসম্পদ শহরের আশপাশের এলাকায় সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনও অঞ্চলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫০-এর দশকের পর থেকে জিনজিয়াংয়ের হিমবাহের আয়তন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। উরুমছি নদীর উৎসের সঙ্গে সম্পর্কিত তিয়ানশান হিমবাহও সংকুচিত হয়ে দুটি ছোট হিমবাহে বিভক্ত হয়েছে।
শহরটির জলবায়ুতে গ্রীষ্ম ও শীতের মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা যায়। গ্রীষ্মকাল উষ্ণ থেকে গরম হলেও শীত অত্যন্ত শীতল। জানুয়ারিতে দৈনিক গড় তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস ১২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং জুলাইয়ে প্রায় ২৪ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
কেন গুরুত্বপূর্ণ উরুমছি?
উরুমছি চীনের পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন, বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। ঐতিহাসিকভাবে এটি মধ্য এশিয়া ও চীনের মধ্যবর্তী যোগাযোগের বিস্তৃত অঞ্চলের অংশ। আধুনিক সময়ে রেল যোগাযোগ, জ্বালানি শিল্প এবং নগর সম্প্রসারণ শহরটির গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে জিনজিয়াংয়ের জাতিগত বৈচিত্র্য, ঐতিহাসিক সংঘাত, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনা উরুমছিকে শুধু একটি শহর নয়, বরং চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় নীতি ও ইতিহাস বোঝার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরে।
প্রাচীন বাণিজ্যপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল থেকে আধুনিক নগরকেন্দ্রে রূপান্তরিত হওয়া উরুমছির ইতিহাস তাই একই সঙ্গে নগরায়ণ, সাম্রাজ্য বিস্তার, জাতিগত সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ইতিহাস।