জাতীয় সংসদে দীর্ঘদিনের একটি চেনা দৃশ্য হলো, অধিবেশনকক্ষে প্রবেশ কিংবা বের হওয়ার সময় স্পিকারের চেয়ারের দিকে মুখ করে সংসদ সদস্যদের মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান প্রদর্শন করা।
দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা এই রীতি নিয়ে সম্প্রতি সংসদের ভেতরেই প্রশ্ন তোলেন এক সদস্য, যা একপর্যায়ে ধর্মীয় ও সংসদীয় রীতির এক চুলচেরা বিশ্লেষণে রূপ নেয়। অবশেষে সেই বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে ঐতিহাসিক এক রুলিং দিলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, স্পিকারের চেয়ার বা সভাপতির প্রতি সম্মান জানানোর ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা এখন থেকে নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করতে পারবেন, কারণ কার্যপ্রণালি বিধি থেকে ‘ঝুঁকিয়া’ শব্দটি অনেক আগেই বাদ দেওয়া হয়েছে।
এই আলোচনার সূত্রপাত হয়েছিল গত ১৬ জুন। ওই দিন পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান স্পিকারের প্রতি মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানানোর প্রচলিত এই বিষয়টি সুরাহার জন্য একটি অনুরোধ জানান। তিনি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আপত্তি তুলে ধরে যুক্তি দেন যে, মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানানোর এই ঔপনিবেশিক বা প্রচলিত রীতিটি ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এটি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ‘শিরকের কাছাকাছি চলে যায়’। মুসলিম সংসদ সদস্যদের জন্য বিষয়টি সংবেদনশীল উল্লেখ করে তিনি এই নিয়মের একটি স্থায়ী ও সম্মানজনক সমাধান দাবি করেন। সে সময় বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে নিষ্পত্তি না করে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ সংসদকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখে এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরবর্তীতে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা রুলিং দেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সংসদের নির্ধারিত অধিবেশনে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সেই রুলিং দেন স্পিকার। নিজের সিদ্ধান্ত জানাতে গিয়ে তিনি সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির চুলচেরা বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। স্পিকার বলেন, জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ২৬৭ নম্বর বিধি অনুযায়ী, সংসদের বৈঠক চলাকালে কক্ষে প্রবেশ করার বা সংসদকক্ষ ত্যাগ করার সময় এবং আসন গ্রহণ বা ত্যাগ করার সময় যেকোনো সদস্যেরই সভাপতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এটি সংসদের একটি অন্যতম প্রধান শিষ্টাচার।
তবে এই বিধির পেছনের ইতিহাস ও সংশোধনের বিষয়টি অনুসন্ধান করতে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসে, যা আজ স্পিকার নিজেই সংসদকে অবহিত করেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ জানান, তিনি বিষয়টি গভীরভাবে পরীক্ষা করে দেখেছেন যে, অষ্টম জাতীয় সংসদেই এই বিধিতে একটি বড় পরিবর্তন আনা হয়েছিল। তৎকালীন সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিসংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি সংসদে একটি সুনির্দিষ্ট প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছিল, যা পরবর্তীতে সংসদ কর্তৃক বিস্তারিতভাবে বিবেচিত এবং সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সেই প্রতিবেদনের আলোকেই ২৬৭ (১) বিধির সংশোধনীতে পুরোনো নিয়ম থেকে ‘ঝুঁকিয়া’ শব্দটি স্থায়ীভাবে বাদ দেওয়া হয়। অথচ দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও অজ্ঞতা বা অভ্যাসবশত পুরোনো সেই রীতিই সংসদে চর্চা হয়ে আসছিল।
স্পিকার তাঁর রুলিংয়ের শেষ অংশে অত্যন্ত উদার ও বাস্তবসম্মত এক নির্দেশনা দিয়ে সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, যেহেতু বর্তমান কার্যপ্রণালি বিধি থেকে ‘ঝুঁকিয়া’ শব্দটি আইনগতভাবেই বাদ দেওয়া হয়েছে, তাই মাথা নিচু করার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা আর অবশিষ্ট নেই। এখন থেকে আপনারা জাতীয় সংসদে যাঁর যাঁর ধর্মীয় মূল্যবোধ ও রীতি অনুযায়ী স্পিকারের চেয়ার বা সভাপতির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করবেন। স্পিকারের এই সময়োপযোগী ও ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্তের পর সংসদকক্ষে এক স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি হয়, যা সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংসদীয় শিষ্টাচারের এক অনন্য সমন্বয় হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।
মাসিক সম্মানী ভাতা পাওয়া জুলাই যোদ্ধাদের সংখ্যা জানালেন মন্ত্রী
এক কোম্পানি অধীনে চলাচল করবে ঢাকার গণপরিবহন