নৌপরিবহন অধিদপ্তরের হিসাবে দেশে নিবন্ধিত অভ্যন্তরীণ নৌযানের সংখ্যা প্রায় ২২ হাজার ৩০০। তবে দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ নৌযান শুমারিতে এরই মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার নৌযান শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ নিবন্ধিত নৌযানের তুলনায় শুমারিতে পাওয়া নৌযানের সংখ্যা প্রায় ১২ গুণ বেশি। এতে নদী, উপকূল ও সাগরে চলাচলকারী নৌযানের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে সরকারের কাছে এত দিন বড় ধরনের তথ্যঘাটতি থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারি হিসাবের বাইরে থাকা এত বিপুলসংখ্যক নৌযান এত দিন কীভাবে প্রকাশ্যে চলাচল করেছে। এসব নৌযানের কতগুলো নিরাপত্তার সরকারি মানদণ্ড মেনে চলছে, তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। তাঁদের মতে, দেশে নৌযান ব্যবস্থাপনা, নৌ নিরাপত্তা ও নৌপথের পরিকল্পনা এত দিন মূলত অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই হয়েছে।
তথ্যঘাটতি দূর করতে প্রায় আট বছর ঝুলে থাকার পর শুরু হয়েছে নৌযান শুমারি। গত ২০ থেকে ২৯ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে শুমারি পরিচালনা করা হলেও কার্যক্রম এখনো চলছে। আগামী ডিসেম্বর নাগাদ নৌযানের সংখ্যা ও অন্যান্য তথ্যসহ চূড়ান্ত ফল পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে নৌপরিবহন অধিদপ্তর।
‘নৌযানের ডেটাবেইস তৈরি ও নৌযান ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ’ প্রকল্পের পরিচালক ও নৌপরিবহন অধিদপ্তরের চিফ নেভাল আর্কিটেক্ট কমান্ডার সাইফুল আহমাদ বলেন, ‘নৌযান শুমারি এখনো চলমান। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সঙ্গে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের সমঝোতা স্মারক হয়েছে। তাদের মাধ্যমে শুমারির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার নৌযান শুমারির আওতায় এসেছে। আগামী ডিসেম্বর নাগাদ চূড়ান্ত জরিপের তথ্য পাওয়া যাবে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত নৌযান নিবন্ধনের কার্যক্রম চলবে।’
দেশে বৈধ ও অবৈধ নৌযানের প্রকৃত সংখ্যা জানতে ২০১৬ সালে শুমারির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদন না পাওয়ায় এত দিন তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। প্রায় আট বছর অপেক্ষার পর ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৩ কোটি ৭ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য দেশের নৌযানের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল তথ্যভান্ডার তৈরি করা। পাশাপাশি নৌযান ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বাড়ানো এবং নৌচলাচলকে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব করতে নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগও রয়েছে।
নিবন্ধিত নৌযানের তালিকায় রয়েছে নানা ধরনের যান
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশে নিবন্ধিত অভ্যন্তরীণ নৌযান ছিল ২২ হাজার ৩০০টি। এসব নৌযানের মধ্যে রয়েছে যাত্রীবাহী লঞ্চ ও বোট, মালবাহী, তেলবাহী ও বালুবাহী নৌযান, ড্রেজার, কাটার সাকশন ড্রেজার, টাগবোট, স্পিডবোট, ফেরি, ওয়ার্কবোট, পরিদর্শন বোট, ট্যুরিস্ট লঞ্চ ও বোট, বার্জ, হাউসবোট, ওয়াটার ট্যাক্সি, ফ্লোটিং পাম্প, পন্টুন, ক্রেনবোট ও ভাসমান হাসপাতালসহ বিভিন্ন ধরনের নৌযান।
চলমান মাঠপর্যায়ের শুমারিতে এ পর্যন্ত ২ লাখ ৭০ হাজার নৌযান পাওয়া গেছে। নিবন্ধিত নৌযানের সংখ্যার সঙ্গে শুমারিতে শনাক্ত নৌযানের এই বিশাল ব্যবধান দেশের নৌযান ব্যবস্থাপনায় পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডারের অভাবকে সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোন নৌযান কোন পথে চলাচল করছে, মালিক কে, কী ধরনের ইঞ্জিন ব্যবহৃত হচ্ছে এবং নৌযানটি কতটা নিরাপদ—এসব তথ্য এক জায়গায় না থাকলে কার্যকর নজরদারি করা কঠিন।
তবে শুমারির চূড়ান্ত তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত শনাক্ত নৌযানগুলোর মধ্যে কতগুলো নতুন, কতগুলো আগে থেকেই চলাচল করলেও নিবন্ধনের বাইরে ছিল এবং কোন শ্রেণির নৌযান কতটি রয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে না।
শুমারিতে সংগ্রহ করা হচ্ছে যেসব তথ্য
নৌযানের সংখ্যা ছাড়াও শুমারিতে এর ধরন, আকার-আকৃতি, মালিক ও চালকের তথ্য, ইঞ্জিন, জ্বালানি ব্যবহার, নকশা এবং জরিপসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সমুদ্রগামী, উপকূলীয় ও অভ্যন্তরীণ জলসীমায় চলাচলকারী সব ইঞ্জিনচালিত নৌযান এর আওতায় রয়েছে। এ ছাড়া ডাম্ববার্জ এবং অন্য নৌযান দিয়ে টেনে বা ধাক্কা দিয়ে চালানো অযন্ত্রচালিত নৌযানও শুমারির অন্তর্ভুক্ত।
চূড়ান্ত তথ্যভান্ডার তৈরি হলে নৌপরিবহন খাতে এত দিন বিচ্ছিন্নভাবে থাকা নানা তথ্য একই ব্যবস্থার আওতায় আসবে। পাশাপাশি সরকারি হিসাবের বাইরে থাকা নৌযানগুলোর তথ্যও যুক্ত হবে।
প্রকল্পের আওতায় শুমারিতে পাওয়া নৌযানগুলোকে পর্যায়ক্রমে অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ অনুযায়ী নিবন্ধন ও জরিপের আওতায় আনার জন্য একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হবে।
নিবন্ধনের বাইরে থাকা নৌযানে নিরাপত্তাঝুঁকি
দেশে নৌযানের প্রকৃত সংখ্যা ও ধরন না জানার সমস্যা শুধু প্রশাসনিক নয়, এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নৌ নিরাপত্তা। নিবন্ধন ও জরিপের বাইরে থাকা নৌযানের ইঞ্জিন, কাঠামো, ধারণক্ষমতা কিংবা নিরাপত্তা সরঞ্জাম সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য না থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি পরিমাপ বা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
দেশের নৌপরিবহন খাত এমনিতেই নানা সংকটে রয়েছে। নৌপথের নাব্যতা কমে যাওয়া, পর্যাপ্ত ড্রেজিং না হওয়া, নদী দখল, আধুনিক ঘাট ও টার্মিনালের অভাব, মালবাহী নৌযান ও যাত্রীবাহী নৌযানের অধিক বয়স এবং নিরাপত্তা সরঞ্জামের ঘাটতি নৌচলাচলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে রেখেছে। এর সঙ্গে রয়েছে দক্ষ জনবলের ঘাটতি ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনায় ধীরগতি।
নৌপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. ইমরান উদ্দিন বলেন, ‘নৌযান শুমারিতে বিপুলসংখ্যক নৌযান শনাক্ত হওয়া অবশ্যই বড় অর্জন। তবে শুমারি করা আর নিবন্ধন করা এক বিষয় নয়। শুমারির পর এসব নৌযানকে নিয়মিত সার্ভের আওতায় এনে ফিটনেস সনদ ও নিবন্ধন নিশ্চিত করতে হবে। ২ লাখ ৭০ হাজার নৌযান যথাযথভাবে সার্ভে ও নিবন্ধনের জন্য বিআইডব্লিউটিএর সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। বর্তমানের সীমিতসংখ্যক সার্ভেয়ার দিয়ে এত বিপুল নৌযান নিয়মিত সার্ভে করা সম্ভব কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ৯০ শতাংশ নৌযানও যদি নিবন্ধনের আওতায় আনা যায়, সেটি বড় সাফল্য হবে। এরপর বাকি নৌযানগুলোকে পর্যায়ক্রমে নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে।’
নৌ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, শুমারি শেষে বিপুলসংখ্যক নৌযানের তথ্য কার্যকর ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। শুধু তথ্যভান্ডার তৈরি করে রাখলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। কোন নৌযান নিবন্ধিত, কোনটি অনিবন্ধিত এবং কোনটি আইন বা নিরাপত্তার মানদণ্ড পূরণ করছে না, তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ এবং নৌযানের সংখ্যা ও ধরন অনুযায়ী নৌপথ, ঘাট ও টার্মিনালের পরিকল্পনা করতে হবে।
ইন্দোনেশিয়ায় সাগরে জাহাজ ডুবি, নিখোঁজ ১৪০ যাত্রী
আগামীকাল সিলেট যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি
সৌদির ৪ অঞ্চলে সতর্কবার্তা জারি