মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলার বিকল্প খুঁজছেন ট্রাম্প

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০০ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে নতুন করে সামরিক হামলার সম্ভাবনা নিয়ে বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করছে ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য আটলান্টিক-এর এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর সম্ভাব্য পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোয়াইট হাউস মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরকে ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে হামলার বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তুত করতে বলেছে। তবে হামলার পরিধি, সম্ভাব্য লক্ষ্য এবং শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন সত্যিই সামরিক অভিযান চালাবে কি না—এসব বিষয়ে এখনো আলোচনা চলছে।

নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম নিয়ে চাপ

দ্য আটলান্টিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিকল্পনার পেছনে দুটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে—জ্বালানির দাম কমানো এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরান সংঘাতে অগ্রগতির বার্তা দেওয়া।

ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ও ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন জ্বালানির মূল্য কমানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপও নিয়েছে।

৫ অক্টোবর ট্রাম্প সড়ক পরিবহনে করমুক্ত ‘রেড-ডাইড ডিজেল’-এর ব্যবহার সম্প্রসারণের নির্দেশ দেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম প্রায় গ্যালনপ্রতি ৬.৫০ ডলারে পৌঁছানোয় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এর আগে জি-৭ দেশগুলো বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ আনার জন্য আগামী কয়েক মাসে ১০ কোটি ব্যারেল তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি ছাড়ার পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে।

সামরিক উপস্থিতিও বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতিও সম্প্রসারিত হচ্ছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৯ হাজার অতিরিক্ত মার্কিন সেনা এবং তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরী মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হচ্ছে। এর ফলে অক্টোবরের শেষ নাগাদ ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক সদস্যের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়াতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে USS Theodore Roosevelt ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ এবং USS Makin Island অ্যাম্ফিবিয়াস রেডিনেস গ্রুপ। এই সামরিক মোতায়েনকে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা মোকাবিলায় ওয়াশিংটনের প্রস্তুতি জোরদারের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো মানেই নতুন হামলার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে—এমনটি বলা যাচ্ছে না। দ্য আটলান্টিকের প্রতিবেদনেও সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে প্রশাসনের অভ্যন্তরে মতপার্থক্যের কথা উঠে এসেছে।

৩ নভেম্বর মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৩ নভেম্বর। এই নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ হবে। ফলে ইরান যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্য ও মূল্যস্ফীতি এখন মার্কিন রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ৬২টি হাউস ও সিনেট আসনের মধ্যে ৪১টি আসনে রিপাবলিকান প্রার্থীরা কোনো না কোনোভাবে ট্রাম্পের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করছেন বা তাঁর সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ককে সীমিতভাবে তুলে ধরছেন। প্রতিবেদনে ইরান সংঘাত ও অর্থনৈতিক চাপকে এ অবস্থানের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে AP-NORC-এর সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১৭ শতাংশ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক ট্রাম্পের জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলার নীতিতে সন্তুষ্ট। ২৬ শতাংশ তাঁর সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সন্তুষ্ট বলে জানিয়েছে। জরিপে ইরান যুদ্ধ ও অন্যান্য নীতির সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সম্পর্ক নিয়েও মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।

ট্রাম্পের ‘খুব শিগগির’ যুদ্ধ শেষ করার বক্তব্য

ট্রাম্প এর আগে একাধিকবার ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ খুব শিগগির শেষ হওয়ার কথা বলেছেন। তবে নতুন হামলার পরিকল্পনার খবর সেই বক্তব্যের সঙ্গে একটি জটিল সমীকরণ তৈরি করছে।

দ্য আটলান্টিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরে সম্ভাব্য হামলার আকার ও লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে নির্বাচনের পর হামলার বিকল্পও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, এখনো চূড়ান্ত সামরিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনটি দাবি করছে না।

হামলা হলে ঝুঁকি কোথায়?

ইরানের ওপর নতুন মার্কিন হামলা হলে তার প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালি, জ্বালানি সরবরাহ এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে তেল ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়লে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে। ফলে যে উচ্চ জ্বালানি মূল্য কমানোর উদ্দেশ্যে সামরিক পদক্ষেপ বিবেচনা করা হচ্ছে, সংঘাত বাড়লে সেই লক্ষ্য উল্টো চাপে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। দ্য আটলান্টিকের প্রতিবেদনে সম্ভাব্য সীমিত হামলা তেলের বাজার বা ইরানের সামরিক সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন আনবে কি না, তা নিয়েও প্রশাসনের মধ্যে মতভেদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা এবং তেহরানের প্রতিক্রিয়া—দুটিই এখন মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ওয়াশিংটনের সামনে দুটি পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য রয়েছে—একদিকে জ্বালানির দাম কমিয়ে অর্থনৈতিক চাপ প্রশমিত করা, অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখা। সম্ভাব্য নতুন হামলার সিদ্ধান্ত সেই দুই লক্ষ্যকে একই সঙ্গে এগিয়ে নেবে, নাকি উল্টো আঞ্চলিক সংঘাত ও জ্বালানি বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি করবে—তা এখনো অনিশ্চিত।

এমইউ
আরও পড়ুন