দেশব্যাপী ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় কারা নগদ সহায়তা পাবেন, আর কারা বাদ পড়বেন তা নির্ধারণে অগ্রাধিকার ও বহির্ভুক্তির মানদণ্ড ঠিক করেছে সরকার। নির্ধারিত আটটি শর্তের যেকোনো একটি পূরণ হলে সংশ্লিষ্ট পরিবার এ কর্মসূচির সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হবে না। অন্যদিকে, হতদরিদ্র, নিম্নআয়ের, ভূমিহীন, নারীপ্রধান ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে দেওয়া হবে অগ্রাধিকার।
সোমবার (১২ অক্টোবর) থেকে দেশব্যাপী পরিবারভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ শুরু হচ্ছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে সরকারের প্রশিক্ষিত ও পরিচয়পত্রধারী কর্মীরা তথ্য সংগ্রহ করবেন। যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে যেসব পরিবারের সহায়তা বেশি প্রয়োজন, তাদের চিহ্নিত করা হবে।
ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহ শুরু
গত ৮ অক্টোবর সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে জানানো হয়, ১২ অক্টোবর থেকে দেশের সব এলাকায় একযোগে থানা ও পরিবারের তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হবে। এ জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড থানা তথ্যভান্ডারের তথ্য সংগ্রহ নির্দেশিকা, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে।
কর্মসূচি সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিতে মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা ও গির্জার মাধ্যমে প্রচারণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিবারগুলোর প্রকৃত আর্থসামাজিক অবস্থা তুলে ধরে সঠিক তথ্য দেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
এদিকে, ফ্যামিলি কার্ডের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কেউ টাকা চাইলে তা না দিতে সতর্ক করা হয়েছে। তথ্য দেওয়ার জন্য কোনো অর্থের প্রয়োজন নেই। কেউ অর্থ দাবি করলে ১০৯৮ নম্বরে জানানোর কথা প্রচারণার বার্তায় উল্লেখ রয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ডে অগ্রাধিকার পাবেন যারা
কর্মসূচির আওতায় গ্রামীণ হতদরিদ্র, নিম্নআয়ের, উপার্জনে অক্ষম সদস্যবিশিষ্ট, ভূমিহীন, নারীপ্রধান ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিশেষ করে বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত, স্বামী পরিত্যক্ত ও অসচ্ছল নারীপ্রধান পরিবার এ তালিকায় থাকবে।
এ ছাড়া ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী অবিবাহিত মেয়ের পরিবার, প্রত্যাগত অভিবাসী—বিশেষত নারী অভিবাসীর পরিবার এবং শিশু, প্রতিবন্ধী বা অটিজম আক্রান্ত সদস্য রয়েছেন এমন পরিবারও অগ্রাধিকার পাবে।
যেসব পরিবারের ঘরের দেয়াল মাটি, পাটকাঠি বা বাঁশ দিয়ে তৈরি, সেসব পরিবারের পাশাপাশি ভূমিহীন কৃষিশ্রমিক ও দিনমজুর পরিবারকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ভূমিহীন পরিবারের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, যেসব পরিবারের বসতভিটা ও কৃষিজমি নেই, কিন্তু তারা কৃষিনির্ভর, তারা এ শ্রেণিতে পড়বে। এ ছাড়া সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বসতভিটা রয়েছে, কিন্তু কৃষিযোগ্য জমি নেই—এমন পরিবারও ভূমিহীন হিসেবে বিবেচিত হবে।
ফ্যামিলি কার্ডের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র থাকতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর বা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে সুপারিশ আসতে হবে।
যে আট শর্তের যেকোনো একটি থাকলে কার্ড মিলবে না
ফ্যামিলি কার্ডের নগদ সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে নীতিমালায় একটি বহির্ভুক্তির তালিকা রাখা হয়েছে। নিচের আটটি শর্তের যেকোনো একটি প্রযোজ্য হলে সংশ্লিষ্ট পরিবার কর্মসূচির সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হবে না।
১. নির্ধারিত সীমার বেশি পিএমটি স্কোর: সরকারের নির্ধারিত প্রক্সি মিনস টেস্ট (পিএমটি) স্কোরের ঊর্ধ্বসীমা অতিক্রম করলে পরিবারটি ফ্যামিলি কার্ড পাবে না।
২. নিয়মিত বেতন-ভাতা পাওয়া নারীপ্রধান: পরিবারের মনোনীত নারীপ্রধান সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে নিয়মিত বেতন-ভাতা পেলে সুবিধা পাবেন না। এমপিওভুক্ত শিক্ষক বা কর্মচারী হলেও এ সুবিধা পাওয়া যাবে না।
৩. সরকারি পেনশন গ্রহণকারী নারীপ্রধান: পরিবারের মনোনীত নারীপ্রধান নিয়মিত সরকারি পেনশন বা অনুরূপ অবসর সুবিধা পেলে পরিবারটি বাদ পড়বে। তবে প্রতিবন্ধী সন্তান হিসেবে বিশেষ পেনশন সুবিধা গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে এ শর্ত প্রযোজ্য হবে না।
৪. পাঁচ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয় বা বিনিয়োগ: পরিবারের কোনো সদস্যের নামে জাতীয় সঞ্চয়পত্রে পাঁচ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ থাকলে কার্ড পাওয়া যাবে না। একইভাবে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পাঁচ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়, স্থায়ী আমানত (এফডিআর) বা অন্য বিনিয়োগ থাকলেও পরিবারটি বাদ পড়বে।
৫. তিন বা চার চাকার নিবন্ধিত মোটরযান: পরিবারের কোনো সদস্যের নামে বিআরটিএ নিবন্ধিত তিন বা চার চাকার মোটরযান থাকলে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে না। এর মধ্যে সিএনজি বা পেট্রোলচালিত ফোর-স্ট্রোক থ্রি-হুইলার, কার, জিপ, পিকআপ, বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, লরি ও মাইক্রোবাস রয়েছে।
৬. বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসা: পরিবারের কোনো সদস্যের নামে বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে হালনাগাদ লাইসেন্সসহ ব্যবসা থাকলে পরিবারটি সুবিধার বাইরে থাকবে।
৭. করযোগ্য আয়সহ নিয়মিত করদাতা: পরিবারের কোনো সদস্য নিয়মিত করদাতা হলে এবং তাঁর করযোগ্য আয় থাকলে পরিবারটি ফ্যামিলি কার্ডের জন্য যোগ্য হবে না।
৮. নির্ধারিত সীমার বেশি জমি বা বাণিজ্যিক সম্পদ: বসতভিটাসহ পরিবারের মোট আবাদি জমির পরিমাণ শূন্য দশমিক ৫০ একর বা তার বেশি হলে ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া যাবে না। এ ছাড়া কোনো অকৃষি বা বাণিজ্যিক জমি কিংবা স্থানের বাজারমূল্য পাঁচ লাখ টাকার বেশি হলেও পরিবারটি সুবিধার বাইরে থাকবে।
এক পরিবারের একাধিক সদস্য কার্ড পাবেন না
একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে না। এ ছাড়া নির্দিষ্ট সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের মধ্যে যাঁরা সমন্বয়ের আওতায় আসবেন না, তাঁরাও এ কর্মসূচির সুবিধা পাবেন না।
সরকারি উপকারভোগীদের তালিকা সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি সিস্টেমে যাচাই করে দ্বৈত সুবিধা গ্রহণের তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও ফ্যামিলি কার্ডের বাইরে রাখা হতে পারে।
নগদ অর্থ পৌঁছাবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে
ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি নগদ সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী ও নারীদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সুবিধাভোগীদের কাছে অর্থ পৌঁছে দেওয়া হবে।
এ কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাইয়ে অর্থ বিভাগের সামাজিক নিরাপত্তাবিষয়ক ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে। এতে জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মতারিখ, মোবাইল ফোন নম্বর ও ইউনিয়নের নাম দিয়ে নিবন্ধনের সুযোগ থাকবে।
সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি সিস্টেমে এরই মধ্যে চার কোটির বেশি উপকারভোগীর তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। এ তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল ফোন নম্বর বা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে একই ব্যক্তির একাধিকবার তালিকাভুক্তি যাচাই করা যাবে।
এ ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন, টিআইএন, বিটিআরসির আইএমইআই ডেটাবেজ, জাতীয় সঞ্চয়পত্র, সরকারি কর্মচারী ও পেনশনার ডেটাবেজ এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা হবে।
বিকাশ, রকেট, নগদসহ পাঁচটি মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সরকারি অর্থ সরাসরি উপকারভোগীদের কাছে পাঠানো এবং তাৎক্ষণিকভাবে লেনদেন পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তুরস্কে পর্যটকবাহী বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ১১
স্বর্ণখনিতে বিমান হামলায় ৭২ শ্রমিক নিহত
রাজধানীতে সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা গ্রেপ্তার