'পারস্য সভ্যতা নিয়ে বিদ্বেষ ছড়ানো আগুন নিয়ে খেলার শামিল'

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম

ইরানের ইতিহাস, পারস্য সভ্যতা ও জাতীয় পরিচয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজিদ ইবন আল-রেজা। তিনি বলেছেন, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যকে রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা আগুন নিয়ে খেলার শামিল। এ ধরনের বক্তব্য ও দৃষ্টিভঙ্গি বড় ধরনের ভুল সিদ্ধান্ত এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।

সোমবার (১২ অক্টোবর) দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় ইবন আল-রেজা বলেন, ইরান ও পারস্য সভ্যতা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের অবিবেচনাপ্রসূত মন্তব্য ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতা কিংবা কৌশলগত বাস্তবতা সম্পর্কে অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ উপলব্ধির পরিচয় দেয়। তার ভাষ্য, যারা বিদ্বেষ ও ক্ষোভে পরিপূর্ণ ভাষায় ইরান সম্পর্কে কথা বলেন, তারা হয় ইতিহাস জানেন না, নয়তো বর্তমান কৌশলগত পরিস্থিতি সঠিকভাবে বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

ইরানের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, বিপদ কেবল প্রতিপক্ষের দুঃসাহসিক আচরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাস ও সংস্কৃতির পার্থক্যকে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সভ্যতার সংঘাত নিয়ে খেলাটা আগুন নিয়ে খেলার মতো। যারা এ ধরনের সংঘাতের আগুন জ্বালায়, তারা এর বিস্তারের সীমা, পরিণতি কিংবা শেষ কোথায় হবে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। একই সঙ্গে এর ক্ষতিকর প্রভাব কেবল অন্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, এমন নিশ্চয়তাও তাদের নেই।

প্রাচীন ইতিহাস ঘিরে নতুন বিতর্ক
ইবন আল-রেজার এই বক্তব্যের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর এথেন্সে দেওয়া একটি ভাষণ। সেখানে রুবিও প্রাচীন গ্রিস ও পারস্যের যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে পশ্চিমা সভ্যতার বিরুদ্ধে বহিরাগত শত্রুর মোকাবিলার ঐতিহাসিক উদাহরণ উল্লেখ করেন। তিনি খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮০ সালে পারস্যের রাজা প্রথম জার্কসিসের বাহিনীর এথেন্স অভিযানকে সামনে আনেন। পাশাপাশি ইরানের নেতৃত্ব সম্পর্কেও কঠোর মন্তব্য করেন। তার এসব বক্তব্য ইরানের রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

এর জবাবে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই এবং দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ প্রাচীন ইতিহাসের আরেকটি ঘটনা সামনে আনেন। তারা ২৬০ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যের রাজা প্রথম শাপুরের বাহিনীর হাতে রোমান সম্রাট ভ্যালেরিয়ানের বন্দি হওয়ার ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেন। রেজাই সতর্ক করে বলেন, যারা ইতিহাসের প্রসঙ্গ টানেন, তাদের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে।

অন্যদিকে, ইরানের সংস্কৃতিমন্ত্রী রেজা সালেহি-আমিরি পশ্চিমা রাজনীতিকদের দেশটির সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ইরানকে হাজার বছরের পুরোনো সভ্যতা এবং বিশ্ব ইতিহাসের একটি স্থায়ী বাস্তবতা হিসেবে বর্ণনা করেন। তার বক্তব্যেও ইরানের ঐতিহাসিক পরিচয় ও সভ্যতাগত ঐতিহ্যকে খাটো করে দেখার বিরুদ্ধে তেহরানের অবস্থান প্রতিফলিত হয়েছে।

সভ্যতার বিতর্কে বাড়ছে উত্তেজনা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যে সেই বিরোধের সঙ্গে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সভ্যতার পরিচয়ের প্রশ্নও যুক্ত হয়েছে। ফলে দুই দেশের রাজনৈতিক বিরোধে প্রাচীন ইতিহাসের ব্যাখ্যা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

তেহরানের উদ্বেগ, প্রাচীন যুদ্ধের উদাহরণ টেনে বর্তমান রাজনৈতিক বিরোধকে সভ্যতার সংঘাত হিসেবে উপস্থাপন করা হলে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সমালোচকেরা মনে করছেন, ইতিহাসের নির্বাচিত ঘটনাকে বর্তমান ভূরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করলে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান অবিশ্বাস আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

তবে প্রাচীন গ্রিস ও পারস্যের যুদ্ধ কিংবা রোমান সম্রাটের বন্দি হওয়ার ঘটনা আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের সরাসরি নির্দেশক নয়। বর্তমান সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কোন দিকে এগোবে, তা নির্ভর করবে দুই দেশের নীতিগত সিদ্ধান্ত, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং সামরিক পদক্ষেপের ওপর। সূত্র: তাসনিম নিউজ এজেন্সি

এএস
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত