মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি বা মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় পদ ছাড়ছেন কেটি জাকারিয়া। প্রথম সংবাদ সম্মেলনে দুর্বল পারফরম্যান্স এবং আইনজীবী হিসেবে তাঁর যোগ্যতা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই এ সিদ্ধান্ত এলো। তবে তাঁকে সরাসরি বরখাস্ত করা হয়েছে, নাকি ট্রাম্পের পরামর্শে তিনি সরে দাঁড়িয়েছেন তা নিয়ে প্রতিবেদনে ভিন্ন ভাষ্য রয়েছে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, প্রশাসনে তাঁকে অন্য কোনো দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) জাকারিয়া কর্মস্থলে গিয়ে দিনটিকে আর দশটি সাধারণ কর্মদিবসের মতোই ভেবেছিলেন। সকালে রুজভেল্ট রুমে যোগাযোগবিষয়ক দলের বৈঠকেও অংশ নেন তিনি। পরে নিজের ওয়েস্ট উইংয়ের কার্যালয়ে বসে পত্রিকাটিকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন।
দুপুর ১টার দিকে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তা মিলার তাঁর কক্ষে এসে বলেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স তাঁদের সঙ্গে সংক্ষিপ্তভাবে কথা বলতে চান। এরপর জাকারিয়া ভ্যান্সের সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখান থেকে তিনি আর নিজের কাজে বা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাক্ষাৎকারে ফেরেননি।
ট্রাম্পের পরামর্শ: ‘চাকরিটা কি তোমার জন্য?’
শুক্রবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প জানান, সেদিনই জাকারিয়ার সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি জাকারিয়াকে বলেছিলেন, ‘কেটি, এই দায়িত্বটা কি তোমার জন্য? কারণ, সত্যি বলতে, তোমার এই চাকরির প্রয়োজন নেই।’
ট্রাম্প আরও বলেন, জাকারিয়ার জায়গায় তিনি থাকলে দায়িত্বটি নেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতেন।
এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প জাকারিয়াকে পদে থাকার সিদ্ধান্ত নতুন করে ভাবতে বলেছিলেন বলে স্পষ্ট হয়। তবে তাঁকে সরাসরি বরখাস্ত করার ঘোষণা দেননি তিনি। হোয়াইট হাউসও জানিয়েছে, জাকারিয়া প্রশাসনে অন্য একটি দায়িত্বে কাজ চালিয়ে যেতে পারেন; সেই পদ সম্পর্কে তখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি।
শুক্রবার সন্ধ্যায় ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে ফোনে জাকারিয়া বলেন, সীমিত সময় ও তথ্যের মধ্যে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করতে তিনি নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। তাঁর ভাষায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও মার্কিন জনগণের সর্বোত্তম সেবা করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য।
প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই সমালোচনা
গত ৯ অক্টোবর প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে জাকারিয়ার নাম ঘোষণা করা হয়। এর আগে তিনি ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি গ্রুপে যোগাযোগবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন এবং স্বল্প সময়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৩ অক্টোবর হোয়াইট হাউসে তাঁর প্রথম সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেটি ১৫ মিনিটেরও কম সময় স্থায়ী হয় এবং মাত্র তিনটি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক প্রশ্ন করার সুযোগ পান। সংবাদ সম্মেলনে তাঁর প্রস্তুতি, উপস্থাপনা ও কিছু প্রশ্নের উত্তরে অনিশ্চয়তা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।
প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির কাজ শুধু প্রেসিডেন্টের বক্তব্য তুলে ধরা নয়; প্রশাসনের সিদ্ধান্ত, নীতি ও কর্মকাণ্ড নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নেরও উত্তর দিতে হয়। ফলে তাঁর প্রথম সংবাদ সম্মেলনকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক দ্রুতই প্রশাসনের যোগাযোগ কৌশলের আলোচনায় পরিণত হয়।
আইনজীবী পরিচয় নিয়ে বিতর্ক
জাকারিয়ার পদত্যাগের পেছনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল তাঁর আইনগত যোগ্যতা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। ট্রাম্পও তাঁকে দায়িত্ব দেওয়ার সময় ‘অ্যাটর্নি’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার পেপারডাইন ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগ থেকে ২০১১ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন জাকারিয়া। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাজ্যের বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আইন পেশায় কাজ করার অনুমোদন পেয়েছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
১৩ অক্টোবরের সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি কোথায় বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। জাকারিয়ার উত্তর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। পরে তিনি ব্যাখ্যা দেন, প্রশ্নটি ঠিকমতো বুঝতে পারেননি।
১৫ অক্টোবর ফক্স নিউজের উপস্থাপক শন হ্যানিটির অনুষ্ঠানে জাকারিয়া স্বীকার করেন, তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হননি এবং দ্বিতীয়বার পরীক্ষাও দেননি। তাঁর ব্যাখ্যা, আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জনের পর স্বামীর সঙ্গে চীনে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকায় পরীক্ষার ফলকে তিনি তখন খুব গুরুত্ব দেননি। চীনে তিনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক লেনদেনসংক্রান্ত আইনি কাজে যুক্ত ছিলেন বলে জানান।
তবে আইন বিষয়ে ডিগ্রি থাকা আর যুক্তরাষ্ট্রে লাইসেন্সপ্রাপ্ত আইনজীবী হওয়া এক বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্রে আইন পেশায় কাজ করতে সাধারণত সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যের বার কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন। জাকারিয়ার পরিচয় ও যোগ্যতা নিয়ে বিতর্কটি তাই শুধু সংবাদ সম্মেলনের পারফরম্যান্সে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
ফক্স নিউজে সাক্ষাৎকার দিয়েও বিতর্ক থামেনি
নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে জাকারিয়া ফক্স নিউজসহ রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যমে একাধিক সাক্ষাৎকার দেন। কিন্তু বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করার পরও তাঁর আইনজীবী পরিচয়ের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন চলতে থাকে।
হোয়াইট হাউস অবশ্য তাঁর পক্ষে অবস্থান নেয়। প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেন, তিনি পেপারডাইন থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং চীনে আন্তর্জাতিক লেনদেনসংক্রান্ত কাজে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
তবে বিতর্কের মধ্যে ট্রাম্পের পরামর্শে জাকারিয়ার প্রেস সেক্রেটারির পদ ছাড়ার ঘটনা হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। মাত্র কয়েক দিনের দায়িত্বকালে সংবাদ সম্মেলন, পেশাগত যোগ্যতা এবং গণমাধ্যমে ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রচেষ্টা সব মিলিয়ে তাঁর সংক্ষিপ্ত মেয়াদটি আলোচনায় এসেছে।
জাকারিয়া প্রশাসনের অন্য কোনো পদে যোগ দেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে তাঁর ঘটনাটি দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মুখপাত্রের মতো উচ্চপ্রচারিত পদে পেশাগত পরিচয়, জনসমক্ষে বক্তব্য এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সক্ষমতা কত দ্রুত রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসতে পারে।
টসে হেরে ফিল্ডিংয়ে বাংলাদেশ, একাদশে নেই লিটন
হরমুজে ভাসছে আইফোন! ভিডিও ভাইরাল
'যুক্তরাষ্ট্রের বোমা নয়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রই নির্ধারণ করছে ক্ষমতার সমীকরণ'