ইরানে পরিবারের পুরুষদের হাতে এক মাসে অন্তত ১৫ নারী হত্যার শিকার

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০১ এএম

ইরানে গত এক মাসে অন্তত ১৫ নারী ও কিশোরী হত্যার ঘটনা সামনে এসেছে। এসব ঘটনার অনেকগুলোতে স্বামী, ভাই কিংবা পরিবারের অন্য পুরুষ সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। দেশটির সংবাদমাধ্যম রোকনার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে প্রস্তাবিত একটি আইন এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আটকে থাকার মধ্যে এসব হত্যাকাণ্ডের খবর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। হত্যার ঘটনাগুলোর মধ্যে কথিত ‘সম্মান রক্ষার’ নামে হত্যা, বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে বিরোধ এবং পারিবারিক আর্থিক দ্বন্দ্বের মতো বিষয় উঠে এসেছে। তবে কয়েকটি ঘটনার উদ্দেশ্য এখনো স্পষ্ট নয়। এসব ঘটনায় তদন্ত চলছে।

রোকনার প্রতিবেদনে তেহরান, ইসফাহান, তাবরিজ, কেরমানশাহ, কেশম দ্বীপসহ ইরানের বিভিন্ন এলাকার হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে কিশোরী থেকে শুরু করে প্রবীণ নারীও রয়েছেন।

নিহতদের একজন ইয়েগানেহ হোসেইনজাই। ১৬ বছর বয়সী এই কিশোরী ৯ অক্টোবর উত্তর-পূর্ব ইরানের রাজাভি খোরাসান প্রদেশের বাখারজ এলাকায় মারা যান। তাঁর শরীরে গুরুতর শারীরিক নির্যাতনের চিহ্ন ছিল বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

শিশুবিয়ের শিকার ইয়েগানেহ মাত্র ১০ বছর বয়সে এক আত্মীয়কে বিয়ে করেন এবং ১৪ বছর বয়সে স্বামীর সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। তাঁকে হত্যার সন্দেহে তাঁর স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মধ্য ইরানের ইসফাহানে ৮ অক্টোবর নিহত হন ৪০ বছর বয়সী মিনা সোলতানি। দুই সন্তানের এই মাকে তাঁর স্বামী হত্যা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনার আগে ওই ব্যক্তি তাঁদের ২১ বছর বয়সী ছেলেকে বাড়ির বাইরে পাঠিয়ে দেন এবং ১০ বছর বয়সী ছোট সন্তানকে একটি কক্ষে আটকে রাখেন বলে জানা গেছে।

দক্ষিণ ইরানের হরমোজগান প্রদেশের কেশম দ্বীপে ৫ অক্টোবর ২৮ বছর বয়সী মরিয়ম ইয়ারমোহাম্মাদিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। দুই সন্তানের এই মাকে তাঁর ভাই হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাথমিক প্রতিবেদনে কথিত ‘সম্মান রক্ষার’ বিষয়টি সম্ভাব্য উদ্দেশ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

৪ অক্টোবর উত্তর-মধ্য ইরানের সেমনান প্রদেশের শাহরুদে ১৮ বছর বয়সী এক নারী গুলিতে নিহত হন। পরদিন তাঁকে হত্যার কথা স্বীকার করেন তাঁর ১৯ বছর বয়সী ভাই। পারিবারিক ও আর্থিক বিরোধকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তেহরানের মাজিদিয়েহ এলাকায় ৭০ বছর বয়সী স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন এক ব্যক্তি। স্ত্রীর প্রতি সন্দেহকে তিনি হত্যার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

রাজধানীর খাক-এ সেফিদ এলাকায় ৩০ সেপ্টেম্বর এক ব্যক্তি তাঁর শাশুড়ির বসবাস করা ভবনে আগুন ধরিয়ে দেন। স্ত্রী বৈবাহিক সম্পর্কে ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানানোর পর এ ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আগুনে দুই নারীসহ চারজন নিহত হন। অভিযুক্ত ব্যক্তিও মারা যান।

পশ্চিম ইরানের ইলাম প্রদেশের দেহলোরানে ৩৮ বছর বয়সী ফেরেশতেহ ইউসেফজাদেহ ও তাঁর তিন সন্তানকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তাঁর স্বামী মোহাম্মদ মোহাম্মদির বিরুদ্ধে। প্রতিবেদনে শিশুদের বয়স ৯ ও ১৪ বছর বলা হয়েছে; তবে তিন সন্তানের বয়সের বিবরণে অসংগতি রয়েছে। হত্যার পর ওই ব্যক্তিও আত্মহত্যা করেন বলে জানানো হয়েছে।

কেরমানশাহ শহরে ৪৬ বছর বয়সী ফাতেমেহ লোতফি ও তাঁর ২৬ বছর বয়সী মেয়ে জাহরা শাহবাজি গুলিতে নিহত হন। এ ঘটনায় পরিবারের ১৮ বছর বয়সী ছেলেকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

উত্তর-পশ্চিম ইরানের তাবরিজে ৪৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই শহরের আরেক ঘটনায় এক ব্যক্তি স্ত্রীকে হত্যার পর তাঁর মরদেহ রাস্তায় রেখে যান, যাতে ঘটনাটিকে সড়ক দুর্ঘটনা বলে মনে হয়।

দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের কেরমান প্রদেশের বামে ফাতেমেহ-সাদাত তাবাতাবায়ির হত্যার ঘটনায় তাঁর স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তকারীরা তাঁর শ্বশুরের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততাও খতিয়ে দেখছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

সব হত্যাকাণ্ডেই পরিবারের সদস্যরা অভিযুক্ত নন। তেহরানে ১০ অক্টোবর ২৭ বছর বয়সী এক নারী কর্মস্থলে গুলিতে নিহত হন। তাঁর সঙ্গে আগে প্রেমের সম্পর্ক ছিল এমন এক ব্যক্তি তাঁকে হত্যা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের সিস্তান ও বালুচিস্তান প্রদেশের সারাভানে ১১ অক্টোবর মাহসা বোজরগজাদেহ নামে এক তরুণী মা মারা যান। অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা তাঁর গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। হামলাকারী কারা এবং কী কারণে এ ঘটনা ঘটেছে, তা এখনো জানা যায়নি।

রোকনা জানিয়েছে, তদন্ত চলমান থাকা কিংবা নিহতদের পরিচয় ও ঘটনার বিবরণ নিশ্চিত করা সম্ভব না হওয়ায় আরও কিছু হত্যাকাণ্ড তাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কয়েকটি ঘটনার সুনির্দিষ্ট তারিখও পাওয়া যায়নি।

ইরানে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে প্রস্তাবিত আইনটি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে রয়েছে। সরকার ও পার্লামেন্টের মধ্যে মতপার্থক্য এবং আইনের নাম ও ভাষা নিয়ে বিরোধের কারণে এর অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৪ অক্টোবর ইরানের পার্লামেন্টের সামাজিকবিষয়ক কমিটির সদস্য আহমাদ বিগদেলি আইনটি পাসের আহ্বান জানান। ইরানি সংবাদমাধ্যম জামারানকে তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যদের হাতে নারীদের হত্যার মতো ঘটনা প্রতিরোধে আইনটি সহায়ক হতে পারে।

বিগদেলির ভাষ্য, আইনটি ১২ বছর ধরে পার্লামেন্ট ও সরকারের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। ‘সহিংসতা’ ও ‘অপরাধ’-এর মতো শব্দের ব্যবহার এবং আইনের ভাষা নিয়ে মতবিরোধের কারণে বিলটি আটকে আছে। তাঁর মতে, প্রতিরোধ, অপরাধ নির্ধারণ ও শাস্তির বিধানসংবলিত আইনটি পাসের ক্ষেত্রে শব্দচয়ন নিয়ে বিরোধ বাধা হওয়া উচিত নয়।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, ইরানে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষায় সমন্বিত কোনো পূর্ণাঙ্গ আইন নেই। সংস্থাটি নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আইনি বিধানেরও সমালোচনা করেছে।

ইরানের আইনে বাবা ও পিতামহের হাতে সন্তান বা নাতি-নাতনি নিহত হলে প্রতিশোধমূলক শাস্তি ‘কিসাস’ থেকে তাঁদের অব্যাহতির বিধান রয়েছে; তবে অন্য ধরনের শাস্তি প্রযোজ্য হতে পারে।

আলাদাভাবে মানবাধিকার সংস্থা হেঙ্গাও জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ইরানে অন্তত ২০৭টি নারী হত্যার ঘটনা তারা নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে ৩১টি ঘটনায় কথিত ‘সম্মান রক্ষার’ উদ্দেশ্যের সন্দেহ ছিল।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় অন্তত ১৩ নারী, বিবাহবিচ্ছেদ চাওয়ায় ১০ নারী এবং শিশুবিয়ের শিকার ১০ নারী স্বামীর হাতে নিহত হন। এসব হত্যাকাণ্ডের অনেকগুলোতে স্বামী, সাবেক স্বামী, বাবা, ভাই কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যরা জড়িত ছিলেন বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।

অন্যদিকে, ইরানি সংবাদপত্র সাজানদেগি ২৩ সেপ্টেম্বরের পর থেকে পরিবারের সদস্য বা ঘনিষ্ঠজনদের হাতে অন্তত নয় নারী ও কিশোরী নিহত হওয়ার খবর প্রকাশ করেছে। তবে রোকনা ও সাজানদেগির প্রতিবেদনের মধ্যে কতগুলো ঘটনার মিল রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। তাই দুই প্রতিবেদনের সংখ্যা যোগ করে মোট হত্যার হিসাব করা যাবে না।

নারী হত্যার প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণও কঠিন, কারণ ইরানে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ সরকারি পরিসংখ্যানের ঘাটতি রয়েছে বলে সাজানদেগি সতর্ক করেছে।

এএম
আরও পড়ুন