উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার নতুন ছবি প্রকাশ করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। ছবিতে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে একটি পোশাক ও জুতা প্রদর্শনী ঘুরে দেখতে দেখা যায় ৪২ বছর বয়সি এই নেতাকে। ফলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিবিসির চীনবিষয়ক সংবাদদাতা লরা বিকারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত চীনা ভিন্নমতাবলম্বী ওয়ানজুন শিয়ে কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেন, কিমকে কোমায় থাকা অবস্থায় বেইজিংয়ের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল এবং পরে তার মৃত্যু হয়। তার মরদেহ গোপনে উত্তর কোরিয়ায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
শিয়ে নিজেকে চীনা গণতান্ত্রিক দলের চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দেন। চীনা কর্তৃপক্ষের নিষিদ্ধ করা এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত শিয়ে এর আগেও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মৃত্যু নিয়ে অপ্রমাণিত দাবি ছড়িয়েছেন।
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র রোদং সিনমুন প্রকাশিত ছবিতে কিমকে মেয়ে কিম জু এ এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা যায়। ছবিগুলো ঠিক কখন তোলা হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে কিমের মৃত্যুর দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপকে জানিয়েছেন, কিমের মৃত্যু নিয়ে ছড়ানো খবরের সমর্থনে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
উত্তর কোরিয়া বিশ্বের সবচেয়ে গোপনীয় রাষ্ট্রগুলোর একটি। দেশটির শীর্ষ নেতার স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন। ফলে সেখানে কী ঘটছে, তা নিয়ে সহজেই জল্পনা ছড়ায়।
২০২০ সালেও কিমের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে আসা এক পরিচিত ব্যক্তি দাবি করেছিলেন, হৃদ্যন্ত্রের অস্ত্রোপচারের পর কিম মারা গেছেন বলে তিনি ‘৯৯ শতাংশ নিশ্চিত’। কিন্তু কিছুদিন পর কিমকে প্রকাশ্যে দেখা গেলে সেই দাবি ভেস্তে যায়।
বর্তমান গুজবের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ হলো উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা।
দেশটি তিন প্রজন্ম ধরে কিম পরিবারের শাসনে রয়েছে। কিম ইল সুংয়ের মৃত্যুর পর তার ছেলে কিম জং ইলের ক্ষমতা গ্রহণের প্রস্তুতি দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল। ১৯৯৪ সালে কিম ইল সুং মারা যাওয়ার আগেই উত্তরসূরি হিসেবে ছেলের অবস্থান সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
কিন্তু কিম জং উনের ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়া ছিল তুলনামূলক দ্রুত ও অনিশ্চিত। ২০০৮ সালে বাবা কিম জং ইল স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর তাকে দ্রুত ক্ষমতার উত্তরসূরি হিসেবে প্রস্তুত করা হয়। ২০১১ সালে বাবার মৃত্যুর পর তিনি নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এরপর কয়েক বছর ধরে ক্ষমতা সুসংহত করতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে দেন এবং সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলা করেন।
উত্তরসূরি হতে পারেন মেয়ে?
দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা, কিম জং উন তার মেয়ে কিম জু এইকে ভবিষ্যৎ উত্তরসূরি হিসেবে প্রস্তুত করতে পারেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামরিক প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে বাবার সঙ্গে তার উপস্থিতি বেড়েছে।
তবে কিম জু এইর বয়স আনুমানিক ১৩ বছর। তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরসূরি ঘোষণা করা হয়নি। উত্তর কোরিয়ার ইতিহাসে কোনো নারী রাষ্ট্রপ্রধানও ছিলেন না। ফলে তার সম্ভাব্য উত্তরাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কিমের স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো খবর ছড়ালে তা শুধু উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে।
কিম জং উনের ওজন বেশি এবং তিনি প্রচুর ধূমপান করেন। দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা বিভিন্ন সময়ে সতর্ক করেছে, তার জীবনযাপন হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কিম পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ইতিহাস রয়েছে।
কিমের আকস্মিক মৃত্যু বা নেতৃত্বে সংকট দেখা দিলে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে চীনের সীমান্তে শরণার্থীর চাপ বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এ কারণে বেইজিং, সিউল ও ওয়াশিংটন উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখে। দক্ষিণ কোরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৮ হাজার সেনা অবস্থান করায় ওয়াশিংটনের কাছেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
গোপনীয়তাই গুজবের বড় উৎস
উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতার কাছে নিয়মিত পৌঁছানোর সুযোগ পান খুব অল্পসংখ্যক মানুষ। দেশটির ভেতরের নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্যও কঠিন। ফলে অনেক খবরই নিশ্চিত তথ্যের বদলে অনুমান বা অসমর্থিত প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়ার শাসকগোষ্ঠী কখনো কখনো প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল করতে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াতে পারে বলেও সন্দেহ রয়েছে।
তবে ওয়ানজুন শিয়ের দাবির পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল, তা নিশ্চিত নয়। তিনি আলোচনায় আসতে চেয়েছেন, নাকি চীনের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ককে বিব্রতকরভাবে তুলে ধরতে চেয়েছেন, সে বিষয়ে প্রমাণ নেই।
ইরানের মধ্যস্থতার প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি হুথি ও সৌদি আরব
তরুণ প্রজন্মকে সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পক্ষে সোচ্চার থাকতে হবে: রাষ্ট্রপতি
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি গঠন স্থগিতের বিজ্ঞপ্তি চ্যালেঞ্জ করে রিট