ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী, ইরাকভিত্তিক ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং তেহরানের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা—সব মিলিয়ে একাধিক দিক থেকে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে সৌদি আরব। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে দেশটির উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বারবার সক্রিয় হচ্ছে। তবে সব হামলা প্রতিহত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত রাখা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের অনাবাসিক গবেষক আনা জ্যাকবস আনাদোলুকে বলেন, সৌদি আরবের বিশ্বের অন্যতম উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। তবে আগের তুলনায় এখন দেশটিকে অনেক বেশি হুমকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার ও বৃহস্পতিবার পৃথক বিবৃতিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট দেশজুড়ে ১২টি ড্রোন প্রতিহত ও ধ্বংস করার কথা জানিয়েছে। এসব ঘটনা দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতার পাশাপাশি অব্যাহত হামলার চাপও সামনে এনেছে।
সৌদির উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ইয়েমেনে হুথিদের অবস্থানে পাল্টা হামলা চালানোর সক্ষমতা দেশটিকে সামরিক সুবিধা দেয়। কিন্তু প্রতিপক্ষ বারবার হামলা চালিয়ে যেতে পারলে সেই সুবিধাকে স্থায়ী নিরাপত্তায় রূপান্তর করা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রতিরক্ষা ভেদ করে হামলা, প্রাণহানির ঝুঁকিও থাকছে
সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সব হামলা ঠেকাতে পারছে না—এমন উদ্বেগও রয়েছে। প্রতিবেদনে ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের হামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই হামলায় ১৩ জন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি আহত হওয়ার দাবি করা হয়েছে। তবে এ ধরনের বড় হতাহতের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন ধ্বংস করা গেলেও তার ধ্বংসাবশেষ মাটিতে পড়ে হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারে। সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার শায়বাহ তেলক্ষেত্রে আরামকোর একটি স্থাপনা লক্ষ্য করে আসা ড্রোন প্রতিহত করার পর ধ্বংসাবশেষ পড়ে দুজন নিহত ও দুজন আহত হন।
তেল ও গ্যাস স্থাপনা, বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর এবং সামরিক ঘাঁটি রক্ষা করা সৌদি আরবের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এসব স্থাপনার নিরাপত্তার সঙ্গে দেশটির অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্পর্ক রয়েছে।
তুরস্ক-পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা উদ্যোগ
নিরাপত্তা জোরদারে আঞ্চলিক অংশীদারত্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে রিয়াদ। এ ক্ষেত্রে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ৫ অক্টোবর রিয়াদে অনুষ্ঠিত জরুরি বৈঠকে দেশগুলো সৌদি আরবে সম্মত বাহিনী ও সামরিক সক্ষমতা দ্রুত মোতায়েনের বিষয়ে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বুধবার তুরস্কের পার্লামেন্টে চুক্তিটির অনুমোদন চেয়ে একটি বিল জমা দেওয়া হয়। এর ব্যাখ্যামূলক নথিতে বলা হয়েছে, চুক্তিটি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক এবং যৌথ পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পরামর্শ, সম্মতি ও নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
পাকিস্তান ২০২৫ সালের পৃথক দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে তিন দেশের যৌথ চুক্তির আওতায় আরও সেনা পাঠানোর বিষয়টি নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান ৯ অক্টোবর বলেন, রিয়াদে জোটের সদর দপ্তর পরবর্তী সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি স্পষ্ট করেন, হুথিদের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে পাকিস্তানি বাহিনী ইয়েমেনে প্রবেশ করবে না।
সৌদি আরবকে সহায়তার বিষয়ে সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছে মিসরও। দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ১৮ অক্টোবর সম্ভাব্য সামরিক সহায়তার জন্য পার্লামেন্টের অনুমোদন চেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
হুথিদের অস্ত্রভান্ডার কতটা শক্তিশালী?
লন্ডনের কিংস কলেজের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক শিক্ষক রবার্ট পিনফোল্ডের মতে, বারবার সামরিক অভিযানের মুখেও টিকে থাকার সক্ষমতা হুথিদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
আনাদোলুকে তিনি বলেন, অতীতে হুথিরা বড় ধরনের সামরিক আঘাত সহ্য করেও নিজেদের সংগঠিত রাখতে পেরেছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির সময়গুলোকে তারা শুধু অস্ত্র ও সরঞ্জাম পুনরায় সংগ্রহের জন্য নয়, নিজেদের সামরিক সক্ষমতা উন্নত করতেও কাজে লাগিয়েছে বলে তাঁর মূল্যায়ন।
হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করেছে। সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজে তাদের হামলার কারণে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জ্বালানি রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ শুধু ইয়েমেনের দক্ষিণ সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়। উত্তরে ইরাকের দিক থেকেও সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাইয়ে সৌদি আরব ও তার আঞ্চলিক অংশীদারেরা মূল্যায়ন করেছিল যে ইরাকভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে হুথিরা সৌদি ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাব নিয়েও উদ্বিগ্ন রিয়াদ। নিউইয়র্ক টাইমসের বুধবারের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী নির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এটি সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য; নতুন হামলা নিশ্চিত হয়েছে, এমন নয়।
প্যাট্রিয়ট ও থাড: কতটা সুরক্ষা দিতে পারে?
সৌদি আরবের বহুস্তরবিশিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং টার্মিনাল হাই অলটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স বা থাড রয়েছে।
১৫ অক্টোবর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছিল, মদিনার আকাশে একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং দেশের অন্যত্র তিনটি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। তবে ওই দিন সৌদি ভূখণ্ডে হামলা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছিল হুথিরা।
সৌদি আরবের ভৌগোলিক আয়তন প্রায় ২১ লাখ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার। বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে তেল-গ্যাস স্থাপনা, বিমানবন্দর, বন্দর, সামরিক ঘাঁটি ও জনবসতি। ফলে একাধিক দিক থেকে আসা হুমকি শনাক্ত ও প্রতিহত করতে বিস্তৃত রাডার নেটওয়ার্ক, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং দ্রুত পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা প্রয়োজন।
কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনকে শনাক্ত করে ধ্বংস করা যাবে কি না, তা নির্ভর করে তার গতি, গতিপথ, উচ্চতা এবং হামলার আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার সময়ের ওপর। একই সঙ্গে বারবার হামলা হলে প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যেতে পারে। এতে গোলাবারুদ সরবরাহ ও সামরিক প্রস্তুতি বজায় রাখার ওপর চাপ বাড়ে।
বিশেষ করে তেল ও গ্যাস স্থাপনায় হামলা হলে উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিমানবন্দর ও বন্দরে হামলা বাণিজ্য, পর্যটন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
শুধু আকাশ হামলায় কি হুথিদের থামানো সম্ভব?
সৌদি আরবের শক্তিশালী বিমানবাহিনী ইয়েমেনে হুথিদের সামরিক অবস্থানে হামলা চালাতে সক্ষম। কিন্তু আকাশপথে হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন বলে মনে করেন পিনফোল্ড।
তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সাফল্যের জন্য কার্যকর ও সমন্বিত স্থলবাহিনী প্রয়োজন। সৌদি আরব এখনো ইয়েমেনে সরাসরি স্থলবাহিনী পাঠানোর পথে এগোয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
হুথিরা অস্ত্র ছড়িয়ে রাখা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা দ্রুত স্থানান্তর এবং সামরিক সরঞ্জাম গোপন করার কৌশল ব্যবহার করতে পারে। ইয়েমেনের পার্বত্য ভূপ্রকৃতি এসব অবস্থান শনাক্ত ও ধ্বংস করার কাজ আরও কঠিন করে তোলে।
রিয়াদ ইয়েমেনের অভ্যন্তরে হুথিবিরোধী বিভিন্ন শক্তির ওপরও নির্ভর করেছে। কিন্তু এসব গোষ্ঠীর রাজনৈতিক অবস্থান ও আনুগত্য এক নয় এবং তারা সব সময় একক কমান্ডের অধীনে কাজ করেনি বলে পিনফোল্ডের মূল্যায়ন।
২০১৫ সালে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক হস্তক্ষেপের পরও হুথিদের সামরিক ও রাজনৈতিক অবস্থান পুরোপুরি নির্মূল করা যায়নি। নতুন করে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান শুরু হলে তার ব্যয়, রাজনৈতিক ঝুঁকি ও আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকবে; তাতেও স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
কূটনীতি নাকি নতুন সামরিক সংঘাত?
হুথিদের হামলা প্রতিহত করার পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক সামাল দেওয়াও সৌদি আরবের জন্য বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। রিয়াদ একদিকে হামলা নিরুৎসাহিত করতে চায়, অন্যদিকে সংঘাতকে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হওয়া থেকে ঠেকানোর চেষ্টা করছে।
পিনফোল্ডের মতে, হুথিরা সৌদি আরবকে সামরিকভাবে পরাজিত করার চেয়ে ইয়েমেনে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা এবং অতিরিক্ত ছাড় আদায়ের মাধ্যমে নিজেদের অনুকূলে পরিস্থিতি ধরে রাখতে বেশি আগ্রহী হতে পারে। অতীতের কিছু সমঝোতায় হুথি-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের সরকারি কর্মীদের বেতন পরিশোধে সৌদি আর্থিক সহায়তার বিষয়টিও ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আনা জ্যাকবস বলেন, সৌদি নীতিনির্ধারকেরা ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। তবে তাঁদের ধৈর্য কমে আসছে এবং যুদ্ধের আগের পর্যায়ের তুলনায় সামরিক উত্তেজনা বাড়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তাঁর মতে, হুথিদের সম্পূর্ণ সামরিক পরাজয় ঘটানো কঠিন হওয়ায় শেষ পর্যন্ত রিয়াদকে আবারও আলোচনার পথে ফিরতে হতে পারে।
সব মিলিয়ে সৌদি আরবের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানো নয়। বরং বিশাল ভূখণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষিত রাখা, প্রতিরক্ষার ব্যয় ও মজুত সামাল দেওয়া, আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো এবং কূটনীতির মাধ্যমে সংঘাতের বিস্তার ঠেকানো—সবকিছুই একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে দেশটিকে।
১১ হুথি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের দাবি সৌদির
‘আপনার বক্তব্যটা আগে ঠিক করুন’ ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টকে আব্বাস আরাঘচি
গরুর দুধের প্রসাদ খেয়ে জলাতঙ্কে আক্রান্ত! টিকা নিলেন ৪৫০ গ্রামবাসী