যুক্তরাষ্ট্রের সার্ভার ব্যবহার করে ভিন্নমতাবলম্বীদের নিশানা ইরানি হ্যাকারদের

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৯ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রে থাকা একটি সার্ভার ব্যবহার করে ইরানের ভিন্নমতাবলম্বীদের লক্ষ্যবস্তু করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত একটি হ্যাকার গোষ্ঠী। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সেম্পেরিসের গবেষকদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম। কয়েক মাসের বিরতির পর চলতি বছর আবারও তৎপরতা শুরু করা গোষ্ঠীটি এবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সার্ভার ব্যবহার করেছে, যা ২০১৬ সালের পর এই প্রথম শনাক্ত হয়েছে বলে গবেষকদের দাবি।

‘প্রিন্স অব পারসিয়া’ নামে পরিচিত এই গোষ্ঠীটি ‘ইনফি’ নামেও পরিচিত। প্রায় দুই দশক ধরে সক্রিয় গোষ্ঠীটির প্রধান লক্ষ্য ইরানের ভিন্নমতাবলম্বীরা। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও সাইবার হামলা চালানোর অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

সেম্পেরিসের গবেষক তোমের বার জানান, গত আগস্টে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত একটি কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল সার্ভারের সন্ধান পান, যা গোষ্ঠীটির কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যবহৃত হচ্ছিল। সাইবার হামলায় আক্রান্ত কম্পিউটার বা যন্ত্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং সেগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য এ ধরনের সার্ভার ব্যবহার করা হয়।

কয়েক মাস বিরতির পর ফের তথ্য চুরি

সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক সংবাদমাধ্যম সিকিউরিটিওয়িকের প্রতিবেদনে সেম্পেরিসের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর প্রায় তিন মাস গোষ্ঠীটির কার্যক্রম বন্ধ ছিল। পরে ২৭ মে নতুন অবকাঠামো ব্যবহার করে তারা আবার সক্রিয় হয় এবং তথ্য চুরি শুরু করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কার্যক্রম শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যেই গোষ্ঠীটির একটি ক্ষতিকর সফটওয়্যার একটি লক্ষ্যবস্তু থেকে ১ হাজার ৮০০টির বেশি ফাইল সংগ্রহ করে। তবে গোষ্ঠীটির মোট আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম বলে জানিয়েছেন গবেষক বার। তাঁর মতে, এর অর্থ হতে পারে, তারা নির্দিষ্ট ব্যক্তিবিশেষ বা প্রতিষ্ঠানের ওপর অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে হামলা চালাচ্ছে। আবার নতুন কম্পিউটার ব্যবস্থা বা নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ করতে সমস্যার মুখেও পড়তে পারে তারা।

বৈধ ওয়েবসাইটের আড়ালে হামলার অবকাঠামো

সেম্পেরিসের তথ্য অনুযায়ী, পুনরায় সক্রিয় হওয়ার পর গোষ্ঠীটি তাদের সাইবার হামলার অবকাঠামো তৈরির কৌশলও বদলেছে। আগে ভার্চুয়াল প্রাইভেট সার্ভার ব্যবহার করলেও এবার যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার্ড হোস্টিং সেবা ব্যবহার করেছে তারা। এতে তাদের ব্যবহৃত সার্ভার হাজার হাজার বৈধ ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবার সঙ্গে একই অবকাঠামোয় অবস্থান করতে পারে, ফলে সন্দেহজনক কার্যক্রম আলাদা করে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আগস্টে শনাক্ত হওয়া সার্ভারটি গোষ্ঠীটির নতুন ক্ষতিকর সফটওয়্যার পরিবারের ‘টর্নেডো’র সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই সফটওয়্যার টেলিগ্রামভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে ফাইল চুরি করতে পারে বলে জানিয়েছে সেম্পেরিস।

বার বলেন, প্রিন্স অব পারস্যের মতো একটি গোষ্ঠীকে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার্ড হোস্টিং অবকাঠামোর আড়ালে পাওয়া যাবে, তা তাঁরা ভাবেননি। সেম্পেরিস আরও জানিয়েছে, পরবর্তী সময়ে গোষ্ঠীটি ক্লাউডফ্লেয়ারের পেছনে অতিরিক্ত অবকাঠামো তৈরি করতে শুরু করে। এতে তাদের কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল ব্যবস্থা সরাসরি শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

ইরান-সংশ্লিষ্ট সাইবার তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ

ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকারদের বিরুদ্ধে ভিন্নমতাবলম্বীদের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে সাইবার হামলার অভিযোগও বাড়ছে। গত সেপ্টেম্বরে এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে সরকারি ও শিল্প খাতের সাইবার হুমকিসংক্রান্ত সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, ইরান-সংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পানি সরবরাহ, টেলিযোগাযোগ ও জ্বালানি খাতের ব্যবস্থায় হামলার চেষ্টা করেছে। তবে এসব প্রচেষ্টায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করার অভিযোগে অভিযুক্ত হ্যাকারদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে আইনি পদক্ষেপও চলছে। গত মাসে মন্টেনেগ্রো ইরানি-তুর্কি হ্যাকার আমির বারাতিকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে প্রত্যর্পণের অনুমোদন দেয়। তাঁর বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে পরিচালিত একটি সাইবার অভিযানে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। মার্কিন প্রসিকিউটরদের দাবি, ওই বৃহত্তর অভিযানে হাজার হাজার শিক্ষাবিষয়ক অ্যাকাউন্টে অনুপ্রবেশ করা হয় এবং ৩১ টেরাবাইটের বেশি তথ্য চুরি করা হয়। অভিযানের লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সংস্থাও ছিল বলে অভিযোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল

এএস
আরও পড়ুন