জুলাই সনদ নিয়ে চাতুর্যের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে: জামায়াত আমির

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৪ পিএম

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেছেন, জুলাই সনদ নিয়ে শুরু থেকেই চাতুর্যের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। বিএনপি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়নি বলে জনগণ মনে করে। তার দাবি, দেশে-বিদেশে দলের লোকজনকে ‘না’ ভোট দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়তে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

রোববার (২৫ অক্টোবর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে ‘জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পর ২০২৪ সালে দেশে জুলাই বিপ্লব হয়। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ওই সরকার ঐকমত্য কমিশন গঠন করে। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে সাত মাসের বেশি সময় আলোচনার পর বেশির ভাগ বিষয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি সনদ তৈরি হয়। সনদটি বাস্তবায়নের অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালে অংশীজনেরা এতে স্বাক্ষর করেন।

তিনি বলেন, একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। জামায়াতের দাবি ছিল, আগে গণভোট এবং পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা হোক। দুটি ভোট একসঙ্গে হলে বিষয়গুলো গুলিয়ে ফেলার আশঙ্কা ছিল, যা শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তার অভিযোগ, শুরু থেকেই চাতুর্যের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। বিএনপির দাবি ছিল দুটি ভোট একই দিনে আয়োজনের, আর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই দাবি মেনে নিয়েছিল।

জামায়াত আমির বলেন, গণভোটে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একবার হলেও ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়নি বলে জনগণ মনে করে। তার দাবি, দেশে-বিদেশে দলের লোকজনকে ‘না’ ভোট দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে পরিবর্তন ও সংস্কারের পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে। জনগণ অতীতের রাজনীতির পরিবর্তন চায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শফিকুর রহমান বলেন, তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। তরুণেরা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগান দিয়েছিলেন। কিন্তু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়নি, বরং বৈষম্য আরও বেড়েছে। বিএনপি এখন সংবিধানের কথা বলছে কেন, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সাড়ে ১৫ বছর সংবিধান মেনে মিছিল করেও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটানো যায়নি। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারাও ২০৪১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন।

তিনি আরও বলেন, সংবিধান মানলে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হতো না। ওই নির্বাচন না হলে বিএনপি সরকার গঠন করত না, আর জামায়াত বিরোধী দলেও থাকত না। তার মতে, বর্তমান সংবিধান ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে এবং একে স্থায়ী রূপ দিয়েছে। সংবিধানের যেসব জায়গায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন, সেসব বিষয়ে বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে রেখেছে। যেসব বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়নি, সেগুলোও এখন এড়িয়ে চলা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

বিএনপির সংবিধান সংশোধন কমিটিতে আলোচনার আহ্বান প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নিয়ে সমঝোতা করতে হলে জামায়াতের সঙ্গে কমিটিতে বসতে হবে। তার অভিযোগ, বিএনপি প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। জামায়াত জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসবে না এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, এর আগে বহুবার সংবিধান সংশোধন করা হলেও আদালতে গিয়ে তা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। জামায়াত সেই প্রক্রিয়ায় যেতে চায় না। অতীতের ভুল ধারায় না ফিরে তারা সংস্কার চায়।

বিএনপি নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের কাছে ভোট চেয়েছে বলেও অভিযোগ করেন জামায়াত আমির। এ প্রসঙ্গে তিনি শেখ হাসিনার বক্তব্য এবং আওয়ামী লীগের এক নেতার দাবি উল্লেখ করেন। তার অভিযোগ, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিএনপি সমাজ ও দলের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসাচ্ছে।

শফিকুর রহমান বলেন, অস্ত্র ও মাদকের প্রবেশ ঠেকাতে সরকার ব্যর্থ হচ্ছে। যেসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঠেকানোর সক্ষমতা সরকারের নেই, সেই সরকারের দেশ শাসনের অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার অভিযোগ, বিএনপি জনগণের ওপর কর ও দুর্নীতির বোঝা চাপিয়েছে, প্রবাসীদের দেশে ফেরার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই এবং চাঁদাবাজির কারণে মানুষ অতিষ্ঠ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, তিনি নিজের মন্ত্রণালয়ের কাজ দেখার সুযোগ না পেলেও ধর্ম মন্ত্রণালয়সহ সব মন্ত্রণালয় দেখার যোগ্যতা রাখেন। তার দাবি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিজ দলের এক সংসদ সদস্য বলেছেন, মাদক বন্ধ হচ্ছে না এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এলাকা দিয়ে সবচেয়ে বড় মাদকের চালান আসে। সংবিধান সংশোধনের নামে জনগণকে বিভ্রান্ত না করে নিজের দায়িত্ব পালনে মনোযোগ দিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে জামায়াত আমির বলেন, উপযুক্ত খাবার খেয়ে ঠান্ডা মাথায় দেশ পরিচালনা করতে হবে। জনগণ তাকে ১৫০ টাকায় দুপুরের খাবার খাওয়ার কথা বলেনি; বরং মানুষ যেন স্বস্তিতে দুমুঠো ভাত খেতে পারে এবং শান্তিতে থাকতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। বিএনপির নেতাকর্মীরা মানুষের শান্তি কেড়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

আগামী ৩১ অক্টোবরের লংমার্চ ঘিরে ষড়যন্ত্র না করার হুঁশিয়ারি দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে যৌথ লংমার্চের কাফেলা যেভাবে চট্টগ্রামে পৌঁছেছিল, এবারও তারা জনগণের জন্য একইভাবে গন্তব্যে পৌঁছাবেন। কোনও বাধা বা ষড়যন্ত্র তাদের আটকাতে পারবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জেএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত