নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েও তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী থাকছেন নেতানিয়াহু

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৫ পিএম

ইসরায়েলের নির্বাচনে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকতে যাচ্ছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইহুদি ভোটারদের কাছ থেকে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সমর্থন পাওয়ায় তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর মতো অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি বিরোধীরা। তবে কোনো জোটই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।

বুধবার (২৮ অক্টোবর)  পর্যন্ত প্রায় ৮৬ শতাংশ ভোট গণনা শেষে ইসরায়েলের তিনটি প্রধান টেলিভিশন চ্যানেলের পূর্বাভাসে বলা হয়, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী, কট্টর ডানপন্থী ও অতি-ধর্মীয় দলগুলোর জোট পার্লামেন্টের ১২০টি আসনের মধ্যে ৫৩টি পেতে পারে। অন্যদিকে গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের আসনসংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৪৮টিতে। ভোট গণনা চলতে থাকায় এই হিসাব পরিবর্তিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো পেতে পারে রেকর্ড ১৯টি আসন। তবে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে আইজেনকটের জোটকে এসব দলের ব্যাপক সমর্থন প্রয়োজন হবে। ইসরায়েলের অনেক ইহুদি রাজনৈতিক নেতা আরব দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট গঠনের বিরোধিতা করেন। ফলে বিরোধীদের জন্য ক্ষমতায় যাওয়ার পথ আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

নতুন সরকার গঠনের আলোচনা চলাকালে নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। আগামী বছর আবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তত দিনও তাকে এ দায়িত্বে থাকতে হতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাদের রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের গবেষক গাই লুরি বলেন, আইনগতভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা নিয়মিত সরকারের সমান। তবে এ ধরনের সরকারের ওপর সংযম প্রদর্শনের দায়িত্ব থাকে এবং কিছু ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা তুলনামূলক কম থাকে।

নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বুধবার (২৮ অক্টোবর) গভীর রাতে নিজের লিকুদ পার্টির সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন নেতানিয়াহু। তিনি একটি শক্তিশালী ডানপন্থী জাতীয় সরকার গঠনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সামরিক সাফল্যের কথা তুলে ধরে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে যৌথ সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিজের মিত্র হিসেবে উল্লেখ করে নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের হুমকি চিরতরে দূর করার ক্ষেত্রে দুই দেশের সামনে ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। এর আগে ট্রাম্পও ইসরায়েলি ভোটারদের নেতানিয়াহুকে ক্ষমতায় রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যাতে দুই নেতা ইরানে তাদের অভিযান শেষ করতে পারেন। নির্বাচনের পর ট্রাম্প দাবি করেন, নেতানিয়াহুর প্রতি তাঁর সমর্থন নির্বাচনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

তবে বিরোধী নেতা আইজেনকট নেতানিয়াহুর অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর প্রধান ও সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, নেতানিয়াহুর হাতে নতুন সরকারের ম্যান্ডেট নেই এবং জনগণের আস্থাও নেই। নিরাপত্তাব্যবস্থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকার আহ্বান জানান তিনি।

নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে ইসরায়েলের আর্থিক বাজারেও। মার্কিন ডলারের বিপরীতে দেশটির মুদ্রা শেকেলের দর প্রায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে এক ডলারে ৩ দশমিক ১০ শেকেলে নেমেছে। তেল আবিবের প্রধান শেয়ারবাজার সূচকগুলোও ৩ শতাংশের বেশি পড়ে গেছে।

নির্বাচনের ফল ইসরায়েলের রাজনীতিতে ডানপন্থী প্রবণতা আরও শক্তিশালী হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রভাবের সময়ে মধ্য-বামপন্থী দলগুলো ক্রমেই দুর্বল হয়েছে। বর্তমানে প্রায় সব ইহুদি রাজনৈতিক দলই ভবিষ্যতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করছে। অথচ ১৯৯০-এর দশক থেকে আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থিত শান্তি উদ্যোগগুলোর অন্যতম ভিত্তি ছিল এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন যোদ্ধাদের হামলার পর এটিই ছিল ইসরায়েলের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এরপর গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ইসরায়েল। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে সেখানে ৭৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংস হয়েছে। এই যুদ্ধ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন করেছে।

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। তিনি এসব অভিযোগকে অযৌক্তিক বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এ ছাড়া ইসরায়েলে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাও চলছে, যেগুলোকে তিনি প্রভাবশালী মহলের ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেন।

নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ, যা দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলিদের মধ্যে ভোটদানের হারও ছিল উল্লেখযোগ্য। দেশটির মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশের বেশি এই জনগোষ্ঠীর অনেকেই নেতানিয়াহুর সরকারের আরববিরোধী অবস্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরব দলগুলোর জোট জয়েন্ট লিস্টের কার্যালয়ে বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশের পর উচ্ছ্বাস দেখা যায়। জোটটির প্রার্থী ফাতেন গাত্তাস বলেন, তারা দখলদারত্ব ও বর্ণবাদ প্রত্যাখ্যান করেন এবং ইসরায়েলেই থেকে যাবেন।

এর আগে যে জোট নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়েছিল, তাদের সরকার গঠনে একটি ছোট আরব দলের সমর্থন ছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে আইজেনকটের জোট প্রত্যাশার চেয়ে কম আসন পাওয়ায় জয়েন্ট লিস্টের সমর্থন ছাড়া বিরোধীদের সরকার গঠনের সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। ফলে নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে। সূত্র: আরব নিউজ

এএস
আরও পড়ুন