হাওরে নিরাপত্তা ও কৃষি সংকট: ফসল রক্ষায় চ্যালেঞ্জ

উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চল। এখানে বছরের ছয় মাস জলকাদা, বাকি সময় রুক্ষ মাঠ। কৃষিই এখানকার মানুষের প্রধান পেশা, বিশেষ করে বোরো ধান চাষ। কিন্তু এই ধান রক্ষাই এখন মহাসংকট।

হাওরের পানি কিছুটা কমলেই নতুন বিপদ। কৃষকদের কষ্টের ধান লুটে নিচ্ছে দুর্বৃত্তরা। সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে ধান লুটকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে দুজনের মৃত্যু দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। মঙ্গলবার (১২ মে) সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বরাম হাওরে অতিবৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়া ধান লুটের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীরা জানান, ৬০-৭০টি নৌকা নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে এ লুটপাট চালানো হয়। তাড়ল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বাবুল দাস বলেন, ‘এই হাওরের ষোলআনা ধানের মধ্যে চৌদ্দ আনা পানিতে ডুবে আছে। এখন কিছু লোক তা লুট করে নিচ্ছে।’ পুলিশ অভিযান চালালেও দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়।

দিরাই থানার ওসি এনামুল হক চৌধুরী জানান, আশপাশের কয়েকটি গ্রামের লোকজন নৌকা নিয়ে সেখানে প্রবেশ করে।

ধান লুট করে পালালো কয়েক গ্রামের মানুষ। ছবি: সংগৃহীত

শুধু লুটপাট নয়, একইসঙ্গে হাওর প্লাবিত করেছে অকাল বন্যা। টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে গ্রাম, রাস্তা ও ফসল ডুবে গেছে। কৃষকদের চোখের সামনে পাকা ধান তলিয়ে যায়। এবারের পরিস্থিতি ভয়াবহ। হবিগঞ্জে প্রায় ৩ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমির ১০ হাজার ৮০০ টন ধান নষ্ট হয়েছে। সুনামগঞ্জে ক্ষতি ইতিমধ্যে ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা।

গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। ২০২২ সালে বন্যায় ৫৩ হাজার হেক্টর জমি ডুবে ১৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০২৪ সালে ক্ষতি হয় প্রায় ১৪ হাজার ৪২১ কোটি টাকার। বন্যা এখন আর মৌসুমি ঘটনা নয়, বরং বারবার ফেরা এক দুর্যোগ।

hawor

এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার কৃষক পরিবার। বছরের শুরুতে ঋণ নিয়ে তারা জমি চাষ করে। ফসল নষ্ট বা লুট হলে ঋণ শোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে অনেক কৃষক পথে বসেন; কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। হাওর অঞ্চলে আত্মহত্যার হার বাড়ছে—এ এক ভয়াবহ সামাজিক বিপর্যয়।

বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। যেমন- হাওর অঞ্চলে নদী খনন ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। ফসল কাটার সময় সেনাবাহিনী বা কোস্টগার্ডের সহায়তায় মোবাইল টহল জোরদার করতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে কৃষি ব্যাংকের শাখা স্থাপন ও প্রকৃত কৃষকের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাকা ধান সংরক্ষণের জন্য গোলা ও শুকানোর স্থান প্রয়োজন। সামাজিক সচেতনতা ও গ্রাম প্রতিরক্ষা কমিটি গঠন করতে হবে।

haor-000

হাওরের কৃষক বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। কিন্তু প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা দিন দিন বাড়ছে। ধান লুট আর বন্যা—দুটিই এখন কৃষকের চোখের জল। যদি স্থায়ী সমাধান না হয়, তবে হাওরে কেউ চাষ করবে না। প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও কৃষক সংগঠন—সব পক্ষকে এক হয়ে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু ফসল নয়, রক্ষা করতে হবে লক্ষ মানুষের জীবিকা ও অস্তিত্ব।