হাওড় অঞ্চলের কৃষি সংকট: জলবায়ু, বন্যা ও কৃষকের ঝুঁকি

আপডেট : ০৫ মে ২০২৬, ০৭:১০ পিএম

দেশের খাদ্যভাণ্ডার খ্যাত হাওড় অঞ্চল আজ দুর্বিষহ এক সংকটের মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভরা মৌসুমেই অকাল বন্যা, উজানের ঢল ও টানা বর্ষণে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে কৃষকদের সারা বছরের শ্রম। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হালুয়ারগাঁও এলাকার কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘কী দিয়ে যে চলবো! সব তলায়া গেছে। কিছুই পাই নাই। ধার-দেনা করিয়া সার-বীজ-কীটনাশক কিনছিলাম। কেমনে শোধ দেবো, আর কেমনে কী করবাম জানি না।’

একই সুরে কথা বলেন কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার কৃষক মোহাম্মদ জসিম। তিনি জানান, ‘হাজার হাজার কানি ক্ষেত এখন পানির তলে। ধানটা লাল হয়ে আসছিল, কমলার মতো রঙ। সকালে কাজ করে আসলাম, আর দুপুরে গিয়া দেখি পানি। কাটার সময়ই পাইলাম না—পরদিন পুরোটা তলায়া গেল।’

শুধু ধান কাটাই সমস্যা নয়—যারা ধান কাটতে পেরেছেন, তারাও বিপদে পড়েছেন। একটানা বৃষ্টি ও মেঘ থাকায় রোদের অভাবে পচে যাচ্ছে কাটা ধান। জসিম জানান, ‘এক দিনের রইদে এই ধান শুকাইবো না। সেই রইদ-ই তো পাওয়া যাইতাসে না।’

হাওড়ের নিচু এলাকা বন্যা-প্রবণ। আগে বৈশাখের শেষে বন্যা এলে ততক্ষণে ধান কেটে ঘরে তোলা সম্ভব হতো। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখন হঠাৎ করেই নেমে আসে অকাল বন্যা, যখন মাঠ সোনালি ধানে ভরা। এপ্রিলের শেষ ও মে মাসের শুরুর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নেত্রকোণায় ৯ হাজার ৪৩৪ হেক্টর জমির ইরি-বোরো ধান সম্পূর্ণ পানির নিচে তলে গেছে। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণা মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ৪২ হাজার হেক্টরের বেশি। শুধু সুনামগঞ্জেই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। হবিগঞ্জের চারটি উপজেলায় অন্তত ৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে।

সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি অফিস জানিয়েছে, জেলায় এখনো ১৮ হাজার হেক্টর জমি পানির নিচে। জেলাটির হাওড় এলাকায় ৭১ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হলেও বাকি ২৯ শতাংশ এখনো মাঠেই রয়েছে। হাওড় ও হাওড়ের বাইরের জমি মিলিয়ে গড়ে ৬০ শতাংশ ধান কাটা গেছে, ৪০ শতাংশ এখনো মাঠে—যার বেশির ভাগই পানির তলায়।

নেত্রকোণায় অবস্থা আরও ভয়াবহ। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, সেখানে এখনো ৪৬ শতাংশ ধান মাঠেই পড়ে আছে। কংস ও উপদাখালী নদীর পানি ইতিমধ্যে বিপদসীমার ২১ সেন্টিমিটার ওপরে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত কয়েকদিনে ৯ হাজার ৫০০ হেক্টরের বেশি জমির ধান পুরোপুরি তলিয়ে গেছে।

কিশোরগঞ্জের চিত্রও একই রকম। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, গত শনিবার দুপুর পর্যন্ত হাওরের মাঠপর্যায়ের তথ্যমতে, ৬ হাজার ৭৬৮ হেক্টর জমি পানির নিচে রয়েছে। এরমধ্যে ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলায় ক্ষতির পরিমাণ বেশি। এতে হাওরাঞ্চলের ফসলে আরও ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে।

কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

মৌলভীবাজারের কাউয়াদিঘী হাওড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে—ইতিমধ্যে ৮৮৭ হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। জেলায় মোট ২৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছিল, যার ৮২ শতাংশ ধান কাটা গেলেও বাকি অংশ পানির তলায়।

কেন বারবার ধ্বংস হচ্ছে হাওড়ের ফসল

হাওড় অঞ্চলে এ বছর ১৫ এপ্রিল থেকে ১৫ মে পর্যন্ত বোরো ধান কাটার কথা ছিল। কিন্তু মার্চের মাঝামাঝি থেকেই শুরু হয় বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও ভারী বর্ষণ। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, স্বাভাবিকের চেয়ে বৃষ্টি অনেক বেশি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওড়ে বারবার বন্যার তিনটি প্রধান কারণ হলো—

১. সিলেটের উত্তরে ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জি বিশ্বের অন্যতম বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা। সেখানকার পাহাড়ি ঢল বাংলাদেশের নিচু হাওড় এলাকা দিয়েই প্রবাহিত হয়।

২. নদীগুলো পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। বৃষ্টির বাড়তি পানি নদীগুলো সইতে না পেরে দুকূল ছাপিয়ে হাওড়ে ঢুকে পড়ে।

৩. আগে বর্ষা এলে বন্যা হতো। এখন বর্ষার আগেই অকাল বৃষ্টি ও ঢল শুরু হয়—যখন ধান পাকার জন্য মাঠে থাকে, তখনই পানি চলে আসে।

জাতীয় অর্থনীতিতে প্রভাব কতটা

হাওড়ের সাত জেলা—সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া—মিলিয়ে এ বছর ৯.৬৩ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে, যার প্রায় অর্ধেক হাওড় এলাকায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৭৭ হাজার হেক্টরের বেশি জমি প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। গত মৌসুমে প্রতি হেক্টরে গড়ে ৪ টনের বেশি ফলন হয়েছিল—সেই হিসাবে ৩ লাখ টনেরও বেশি ধান এখন ঝুঁকিতে, যা গত মৌসুমের মোট ২.১৩ কোটি টন বোরো উৎপাদনের প্রায় ১.৪ শতাংশ।

কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান মনে করছেন, সার সংকট, বৃষ্টি ও উজানের ঢলে সৃষ্ট বন্যার কারণে হাওড়াঞ্চলে বোরো উৎপাদন ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে, যা জাতীয় পর্যায়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে।

চালের দামে প্রভাব পড়বে কি

খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (ক্রয়) মো. মনিরুজ্জামান বলছেন, ‘ক্ষতির পরিমাণ খুব বেশি হবে না। বাজারে বড় প্রভাব পড়বে না।’ কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল বায়েস সতর্ক করে বলেন, সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে হাওড় জেলাগুলোতে—যেখানে বোরোই একমাত্র ফসল। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নিজেদের চাহিদার জন্য বাজারের ওপর নির্ভর করতে হবে, যা স্থানীয় চাহিদার চাপ তৈরি করবে। নওগাঁ ধান-চাউল আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নিরোদ বরণ সাহা জানান, উত্তরের জেলাগুলোতে ফলন ভালো হলে হাওড়ের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে পুরো ফসল কাটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত প্রভাব বোঝা যাবে না।

প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সমাধান

হাওড় নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বন্যা দেখা দিলে ব্যবস্থা নিলে হবে না—প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। হাওড়ের কৃষকদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বজ্রপাত। খোলা আকাশের নিচে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতে কাজ করতে গিয়ে প্রতিবছর অনেক কৃষক প্রাণ হারান। হাওড়ের প্রতিটি ইউনিয়নে বজ্রনিরোধক যন্ত্র ও ছোট আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের দাবি উঠেছে দীর্ঘদিন ধরে।

প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো হলো—

১. স্বল্প মেয়াদি ধানের জাত চাষ (১২০-১৪০ দিনের মধ্যে পাকে এমন), যাতে বন্যার আগেই ফসল তোলা যায়।

২. নিয়মিত নদী খনন ও বাঁধ মেরামত—নদীর নাব্যতা বাড়াতে হবে ও দুর্বল বাঁধ জোরদার করতে হবে।

৩. দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা—কৃষকদের মোবাইলে আগাম আবহাওয়ার সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে হবে।

৪. স্বাস্থ্যসেবা—হাওড়ের প্রত্যন্ত এলাকায় প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র ও সাপের কামড়ের অ্যান্টিভেনম সহজলভ্য করতে হবে।

বিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরা বলেন, পুরনো ধানের জাতগুলোর আয়ু ১৪০-১৬০ দিন। এই দীর্ঘ মেয়াদে অকাল বন্যার ঝুঁকি এড়ানো যায় না। ইতিমধ্যে ‘কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন (কেজিএফ)’ ও ‘আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইআরআরআই)’–এর যৌথ উদ্যোগে স্বল্পমেয়াদি (১২০-১৪০ দিন) ও ঠান্ডা সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবনে প্রায় ৩০ হাজার জিনের নমুনা তৈরি করা হচ্ছে। এই জাতগুলো লাগালে বন্যার আগেই ধান কেটে ফেলা সম্ভব।

তবে শুধু বীজের উন্নয়ন নয়, প্রয়োজন দ্রুত বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, ডিজেলের সহজলভ্যতা ও যান্ত্রিক হারভেস্টারের পর্যাপ্ত সরবরাহ। কোনো একক সমাধান নয়—একটি সমন্বিত পদক্ষেপই পারে হাওড়ের কৃষককে বাঁচাতে।

দেশের মোট বোরো উৎপাদনের ২০-৩০ শতাংশ হাওড় অঞ্চলে হয়। অর্থাৎ, প্রতি তিন কেজি ধানের এক কেজি আসে হাওড় থেকেই। অথচ হাওড়ের কৃষকেরা প্রতিনিয়ত প্রাণপণ সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। হঠাৎ বন্যা, বজ্রপাত, সাপের কামড়, জলবাহিত রোগ—কী নেই এই জনপদের কৃষকের ভাগ্যে? তবু তারা ফসল ফলান, দেশকে খাওয়ান। প্রশ্ন হলো—আমরা কি তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছি? জবাবটা হয়তো হাওড়ের পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া ধানের মতোই অস্পষ্ট। তবে যত দ্রুত বোঝা যাবে, তত দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ—হাওড়ের কৃষকেরা বাঁচলে বাঁচবে হাওড়, বাঁচবে কৃষি, বাঁচবে দেশ।

আরও পড়ুন