চরফ্যাশনে গ্রাম প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ

ক্ষোভে নিজেদের টাকায় রাস্তা সংস্কার করলেন স্থানীয়রা

ভোলায় কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা), কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) ও টিআর (টেস্ট রিলিফ) প্রকল্পের আওতায় অর্ধশত কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে রাস্তা নির্মাণে। কোথাও কাজ না করে আবার কোথাও কিছুটা কাজ করে আত্মসাৎ করা হয়েছে এসব প্রকল্পের অর্থ। বাধ্য হয়ে কোনো কোনো রাস্তা মানুষ নিজ উদ্যোগে নির্মাণ করছেন।

জানা গেছে, রাস্তার অভাবে অনেক সময় রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এলাকার মানুষ নিরুপায় হয়ে চাঁদা তুলে রাস্তায় বালু ফেলে তা সচল করলেও কর্তৃপক্ষের নজর কাড়েনি। এ কারণে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এলাকার মানুষের মধ্যে।

Untitled

গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পের আওতায় ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে জেলায় অর্ধশত কোটি টাকা বরাদ্ধ দেয় সরকার। যার মাঝে ৩৫ কোটি ৭ হাজার ৯৮৪ টাকা নগদ এবং ১ হাজার ২৬৯ মেট্রিকটন চাল ও ১ হাজার ২৬৯ মেট্রিকটন গম রয়েছে বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে। 

তবে জেলার চরফ্যাশন উপজেলায় সবচেয়ে বেশি বরাদ্ধ দেওয়া হয়। আর লুটপাট আর দুর্নীতিটা সেখানেই বেশি। এসব লুটপাটে জেলা এবং উপজেলা প্রশাসনের কর্মকতা কর্মচারী ও স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতারা সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এসব ঘটনায় স্থানীয়রা চরম ফুঁসে উঠেছে। তারা ইতোমধ্যেই মানববন্ধন করেছেন অনিয়ম আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে। এসব দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। 

সরেজমিন চরফ্যাশন উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গেলে দেখা যায়, দুলারহাট থানার চর যমুনা গ্রামের একটি রাস্তায় বালু ফেলছে স্থানীয় গ্রামবাসী।

এর মধ্যেই কথা হয় একই গ্রামের আব্দুর রব মাস্টারের সঙ্গে। তিনি জানান, তাদের গ্রামের রাস্তাটি যেভাবে করার কথা ছিল, সেভাবে করা হয়নি। রাস্তার দুপাশে কিছুটা মাটি ফেলা হয়েছে। মাঝে মাটি ফেলা হয়নি। সংস্কার কাজে চরম অনিয়ম রয়েছে। 

একই গ্রামের মহিউদ্দিন বেপারী বলেন, সরকার কাবিখা, কাবিটা ও টিআর প্রকল্পের বিপরীতে কোটি কোটি টাকা বরাদ্ধ দিয়েছে। কাজ কোথায় হয়েছে? সরকারি কর্মকর্তারা, কর্মচারী ও রাজনৈতিক দলের নেতারা লুটপাট করেছেন। উপজেলা প্রশাসন নিজেরাই কাজ করেছে। ব্যাপক অনিয়ম আর দুর্নীতি হয়েছে এসব কাজে। আমরা দুর্নীতিবাজদের বিচার চাই। 

কিছুদূর হেটে যাওয়ার পরই নজরে পড়ে কিছু গ্রামবাসী রাস্তার ওপর বালু ফেলছেন। জানতে চাইলে, মো. দুলাল বলেন, আমরা শুনেছি সরকার আমাদের রাস্তার জন্য টাকা বরাদ্ধ করেছে। অথচ রাস্তার দুই পাশে কিছুটা কাজ হয়েছে। মাঝখানে মোটেও কাজ হয়নি। যে কারণে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যায় অনেকে। এই রাস্তায় যাতে অটে রিকশা প্রবেশ করতে পারে, সেজন্যই গ্রামের প্রতিটি বাড়ি থেকে টাকা তুলেছি। বাকিটা স্থানীয় একজন সমাজ সেবকের সহযোগিতায় এগিয়ে নিচ্ছি। শিশুরা স্কুলে যেতে পারছে না। চরম ভোগান্তির কথা চিন্তা করেই গ্রামের সবার কাছে টাকা তুলে রাস্তায় বালু ফেলা হচ্ছে বলে জানালেন গ্রামের অসহায় এসব মানুষ। 

গ্রামের চর যমুনা রাস্তার পাশেই বাড়ি ছকিনা বিবির। তিনি বলেন, ‘সরকারি বরাদ্দ হয় আর নেতারা ও প্রশাসন মিলে খায়। আমরা কোনো রাস্তা পাই না। বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা তুলে রাস্তায় বালু ফেলা হয়। রাস্তায় গাড়ি আসতে না পারায় দিন ১৫ আগে এক গর্ববতী নারী হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান।’ 

দুলারহাট থানার মুন্সিরহাট বাজারের পাশেই চর নুরুল আমিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৯০ টাকায় বিদ্যালয়ের মাঠ ভরাট করার কথা থাকলেও সেখানে মাত্র ৭৪ হাজার টাকার কাজ হয়েছে বলে জানালেন বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মো. নুরে আলম। এই কাজটি করেছেন চরফ্যাশনের এক বিএনপি নেতা।

ঐ বাজারের ব্যবসায়ী মো. মিলন বলেন, এই মাঠে আমরা স্থানীয়রা মাটি ও বালু ফেলেছি। শিশু-কিশোররা নিয়মিত মাঠে খেলাধুলা করে। মাঠে মাত্র ১০-১২ ট্রলি বালু ফেলা হয়েছে।

ঠিকাদার দুলাল বলেন, আমি সমস্ত টাকার কাজ করেছি। তবে অভিযোগের কথা তুলে ধরার পরে চুপ করে থাকেন তিনি। 

শুধু রাস্তা নয় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ ভরাটসহ নানা কাজে টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তব চিত্রটা ভিন্ন। চরফ্যাশন গোলদারহাটের দক্ষিণ মাদ্রাজ মাধ্যমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন রাস্তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনের রাস্তার জন্য ৮ লাখ ১০ হাজার টাকা বরাদ্ধ দেওয়া হলেও কোনো কাজ হয়নি বলে গ্রামবাসী এবং প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. মিজানুর রহমান সোহেল জানান।

কাজ না হওয়ার বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করলেও চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসনা শারমিন মিথি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, এটা অন্যত্র করা হয়েছে। ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৭৫০টাকায় মাঠ ভরাট করার কথা ছিল পূর্ব চর তোফাজ্জল আসলামিয়া দাখিল মাদরাসায়। বাস্তবতা হচ্ছে ঐ প্রতিষ্ঠানের মাঠ পাকা হয়েছে অনেক আগেই।

স্কুলের সামান্য মেরামতের জন্য প্রতিষ্ঠান সুপার মো. আবু তাহের জানান, তাকে মাত্র ৬০ হাজার টাকা দিয়েছেন প্রকল্প কর্মকর্তা। একইসঙ্গে কাজ সন্তোষজনক হয়েছে এমন প্রত্যয়ন নিয়েছে ঐ প্রকল্প কর্মকর্তা। 

চরফ্যাশন উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তার অফিসে গেলে তিনি বাহিরে আছেন বলে বক্তব্য দেওয়া এড়িয়ে যান। এদিকে চরফ্যাশন উপজেলার এওয়াজপুর ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মো. হোসেন হাওলাদার বাড়ির জামে মসজিদ মাঠ ভরাটের জন্য ৮ লাখ ৭৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ঐ মসজিদের কোনো মাঠ নেই। যেটা আছে সেটা আগে থেকেই ভরাট এবং পাশে কিছু ইট রাখা।

মসজিদের সভাপতি মো. হানিফ বরাদ্দের কথা শুনে অবাক হয়ে বলেন, আপনাদের মাধ্যমেই জানতে পারলাম। আমি কিছুই জানি না। তবে এখানে অন্য একজনকে সভাপতি হিসেবে দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। শুধু এটা নয়, বহু প্রকল্প শুধু কাগজে-কলমে দেখানো হয়েছে বাস্তবে কিছুই হয়নি। হয়েছে শুধু সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী ও কিছু রাজনৈতিক দলের নেতাদের পকেট ভারী। এমন অভিযোগ সাধারণ মানুষের। 

কাজের অনিয়ম ও সম্পূর্ণ টাকার কাজ না হওয়া এবং কাজের পর টাকা না দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসনা শারমিন মিথি।

তিনি বলেন, আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে তদারকি করেছি এবং পিআইও কর্মকর্তা সার্বক্ষণিক মাঠে থেকে তদারকি করেছেন। এখন প্রকল্প গুলো প্রায় সমাপ্তির পথে। কিছু প্রকল্পে ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়েছে। সম্পূর্ণ কাজ না করে প্রতিষ্ঠান প্রধানদের কাছ থেকে কাজ সন্তোষজনক হয়েছে- এমন প্রত্যয়ন নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, এমন ঘটনা শুনেছি। তবে দুই ধরনের কথা আছে। সিপিসি বলছেন, সম্পূর্ণ টাকা পেয়েছেন আর প্রতিষ্ঠান প্রধানরা বলছেন, সম্পূর্ণ টাকা পাননি। পুরো বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন এই কর্মকর্তা। 

এদিকে জেলা ত্রাণ এবং পুনর্বাসন কর্মকর্তা সৈয়দ মো. আজিম উদ্দিন বলেন, প্রকল্পগুলোর বিপরীতে ৩৫ কোটি ৭ হাজার ৯৮৪ টাকা নগদ এবং ১ হাজার ২৬৯.১২৯ মে. টন চাল ও ১ হাজার ২৬৯.১২৯ মে. টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

তিনিও বলেন, প্রকল্প কর্মকর্তা যদি অনিয়ম করে তা হলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিবেন।

অপরদিকে জেলা প্রশাসক মো. আজাদ জাহান বলেন, কাজের অনিয়মের বিষয় জানতে পেরেছি। কাজ হবে না, টাকা নিয়ে যাবে- এমন কোনো কিছু সহ্য করা হবে না। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ও সচেতন মহলের দাবি, প্রশাসন, প্রকল্প কর্মকর্তা ও সিপিসিরা মিলেই এসব টাকা লুটপাট করেছে। কাজ না করে টাকা আত্মসাৎ ও যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তাদের প্রত্যেকের বিষয় সুষ্ঠ তদন্ত করে ব্যবস্থা না নিলে দুর্নীতি লুটপাট থামানো সম্ভব নয়।