মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিজেই রোগী

প্রায় ৭ লাখ মানুষের একমাত্র সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ভরসাস্থল মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কিন্তু জনবল সংকট, চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ানের অভাব, অচল গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং অবহেলিত অবকাঠামোর কারণে হাসপাতালটি যেন নিজেই চিকিৎসার অপেক্ষায়। ২৮২টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ১০৯টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে। এক্স-রে সেবা বন্ধ, অপারেশন থিয়েটার প্রায় অচল, আল্ট্রাসনোগ্রাম সেবা সীমিত। ফলে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা না পেয়ে রোগীদের অনেকেই ছুটছেন পাশের উপজেলা কিংবা জেলা সদর হাসপাতালে।

কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে জনবল ও অবকাঠামোগত সংকটের কারণে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ২২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত বৃহৎ এই উপজেলায় সরকারি স্বাস্থ্যসেবার প্রধান কেন্দ্রটি বর্তমানে নানা সংকটে জর্জরিত।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে অনুমোদিত জনবলের সংখ্যা ২৮২ জন। এর মধ্যে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১৮৩ জন। ফলে ১০৯টি পদ শূন্য রয়েছে।

অনুমোদিত ১০ জন কনসালটেন্টের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ৫ জন। ৪৫ জন মেডিকেল অফিসারের বিপরীতে দায়িত্ব পালন করছেন ২৩ জন। এছাড়া কয়েকজন চিকিৎসক বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত এবং কয়েকজন প্রেষণে অন্যত্র কর্মরত রয়েছেন।

নার্সিং সেবাতেও রয়েছে বড় ধরনের সংকট। অনুমোদিত ৪২ জন নার্সের মধ্যে কর্মরত আছেন ২৮ জন। তৃতীয় শ্রেণির ১৫৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১০২ জন এবং চতুর্থ শ্রেণির ২৯টি পদের মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ১৪ জন।

জনবল সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলোতে। বর্তমানে হাসপাতালে নিরাপত্তাকর্মী রয়েছেন মাত্র একজন। পরিচ্ছন্নতাকর্মী আছেন দুইজন। ফলে বিশাল হাসপাতাল চত্বর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এক্স-রে টেকনিশিয়ানের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে এক্স-রে সেবা কার্যত বন্ধ রয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় অপারেশন থিয়েটারও প্রায় অচল অবস্থায় পড়ে আছে। হাসপাতালের আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন থাকলেও দক্ষ টেকনিশিয়ানের অভাবে রোগীরা নিয়মিত সেই সেবা পাচ্ছেন না।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এত বড় একটি উপজেলার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এভাবে চলতে পারে না। দ্রুত শূন্য পদ পূরণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

এদিকে হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধাও নেই। বিদ্যমান আবাসিক ভবনগুলো দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রায় দুই বছর আগে আবেদন করা হলেও এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে পরিত্যক্ত ভবনগুলো হাসপাতাল চত্বরে অপরিচ্ছন্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রতিদিন গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন। কিন্তু জনবল সংকটের কারণে তাদের প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নুসরাত জাহান বলেন, 'প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে সঠিকভাবে স্বাস্থ্যসেবা দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। শূন্য পদ পূরণসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।'

এ বিষয়ে কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর মোহাম্মদ বশির আহমেদ বলেন, 'সরকার স্বাস্থ্য খাতে ৫ হাজার চিকিৎসক, নার্সসহ প্রায় এক লাখ জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। আশা করছি আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে জনবল সংকট অনেকাংশে দূর হবে এবং স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত হবে।'

মুরাদনগরবাসীর দাবি, দ্রুত শূন্য পদে নিয়োগ, অচল সেবাগুলো চালু এবং আবাসন সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে উপজেলার লাখো মানুষ মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হতে থাকবে।