একদিকে টানা বর্ষণ, অন্যদিকে পাহাড় ধসের আতঙ্ক। ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে এসেছেন শত শত মানুষ। কিন্তু আশ্রয়কেন্দ্রে এসে নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। বড়দের জন্য রান্না করা খাবারের ব্যবস্থা থাকলেও ছোট শিশুদের উপযোগী খাবারের সংকট রয়েছে। কোথাও আবার পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির অভাবও ভোগান্তি বাড়িয়েছে।
বুধবার (৮ জুলাই) নিম্নচাপের প্রভাবে টানা বৃষ্টিতে রাঙামাটির বিভিন্ন এলাকায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। সকাল থেকেই পাহাড়ধস ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি এড়াতে মানুষ আশ্রয় নিতে শুরু করেন জেলার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ২১২টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে এখন পর্যন্ত সাতটিতে প্রায় ৭০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। একই সঙ্গে পাহাড়ি ঢলের কারণে বাঘাইছড়ি ও বিলাইছড়ি উপজেলার নিচু এলাকার অনেক বাড়িঘর প্লাবিত হয়েছে।
শহরের লোকনাথ মন্দির আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, আশ্রিতদের জন্য ভাত ও শুকনো খাবারের ব্যবস্থা থাকলেও শিশুদের জন্য দুধ, সুজি বা বয়স উপযোগী খাবারের কোনো আলাদা ব্যবস্থা নেই। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিয়েও অভিযোগ করছেন অনেকে।
আশ্রয় নেওয়া জসিম উদ্দিন বলেন, ’মঙ্গলবার সকালেই বাড়ি ছেড়ে এখানে এসেছি। পাহাড় ধসে আমাদের বাড়িঘর ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। দুপুর ও রাতে ভাত দেওয়া হয়েছে, সকালে শুকনো খাবারও পেয়েছি। তবে ছোট বাচ্চাদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা দেখিনি।’
একই আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা তাসলিমা আক্তার বলেন, ’আমাদের খাবার দেওয়া হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু শিশুদের জন্য উপযোগী কোনো খাবার নেই। বাধ্য হয়ে বাজার থেকে কেক-বিস্কুট কিনে খাওয়াতে হচ্ছে। বাড়িতে থাকলে অন্তত খিচুড়ি বা নরম খাবার রান্না করে দিতে পারতাম।’
মাবিয়া আক্তারের অভিযোগ, সকালে দীর্ঘ সময় বিশুদ্ধ পানির সংকট ছিল। তিনি বলেন, ’বিদ্যুৎ চলে গেলে পানিও পাওয়া যায় না। ছোট শিশু আর বৃদ্ধদের নিয়ে তখন খুব কষ্ট হয়।’
এদিকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। তীব্র স্রোতের কারণে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় রাঙামাটি-বান্দরবান সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। মহালছড়ি এলাকায় সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কেও যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের কয়েকটি স্থানে পাহাড়ধসের কারণে কিছু সময় যান চলাচল বন্ধ ছিল।
বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা মারজান জানান, কাচালং নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরই মধ্যে মাস্টারপাড়া এলাকায় সড়ক ও কয়েকটি বাড়িতে পানি ঢুকেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি জানান।
তবে আশ্রয়কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি করেছে প্রশাসন। রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. রুহুল আমিন বলেন, দুর্যোগের সময়ে সবার জন্য আলাদা খাবার প্রস্তুত করা কঠিন হলেও রান্না করা খাবার নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে শিশুদের জন্য বিস্কুটের ব্যবস্থাও করা হবে। পানির সংকটের অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, বাঘাইছড়ি ও বিলাইছড়ির কয়েকটি এলাকায় মানুষ এখনও পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। তাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিতে প্রশাসনের দল কাজ করছে। আশ্রয় নেওয়া সবাইকে নিয়মিত রান্না করা খাবার দেওয়া হচ্ছে এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের পর্যাপ্ত ত্রাণ বরাদ্দ রয়েছে।