সরকারি নির্দেশ অমান্য করে পাহাড়ে দেদারসে চলছে ঋণের কিস্তি আদায়

রাঙামাটিসহ চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্রঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে আগামী তিন মাস ঋণের কিস্তি আদায় স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ)। একই সঙ্গে বন্যাদুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ, বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন, প্রয়োজনে দুর্যোগকালীন ঋণ প্রদান এবং গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত সঞ্চয়ের অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে এমআরএর এই নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় বন্যাকবলিত এলাকায় নিয়মিত ঋণের কিস্তি আদায় অব্যাহত থাকার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ও ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতারা।
 
এমআরএর পরিচালক (লাইসেন্স, রেগুলেশন, পলিসি অ্যান্ড ল বিভাগ) মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান স্বাক্ষরিত সার্কুলার লেটার নং-৮৫-এর মাধ্যমে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। গত ১৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে জারি করা সার্কুলারে চট্টগ্রাম বিভাগের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলাকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সার্কুলারে বলা হয়, অতিবৃষ্টিজনিত কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। এ পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের সহায়ক হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

এমআরএর নির্দেশনা অনুযায়ী, বন্যাকবলিত এলাকায় স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত তহবিল থেকে জরুরি খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করতে হবে। পাশাপাশি বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রমেও প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রাখতে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের ঋণের কিস্তি আদায় আগামী তিন মাসের জন্য স্থগিত রাখতে হবে। পরিস্থিতি ও প্রয়োজন বিবেচনায় ক্ষতিগ্রস্তদের দুর্যোগকালীন ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থাও করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো গ্রাহক সঞ্চয়ের অর্থ ফেরত চাইলে তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জেলার দূর্গম উপজেলা ও বন্যায় সর্বোচ্চ ক্ষতি হওয়া বাঘাইছড়ি উপজেলার স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী খোরশেদ আলম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাঙামাটির জেলা প্রশাসককে ট্যাগ করে দেওয়া এক পোস্টে অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক বন্যায় বাঘাইছড়ি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের ৭-৮টি এলাকার মানুষ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। বন্যার পর স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট দিপেন দেওয়ান এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন সরেজমিনে বাঘাইছড়ি গিয়ে ত্রাণ বিতরণ ও বন্যার্তদের সঙ্গে সহমর্মিতা প্রকাশ করেন।

তার দাবি, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি পরিবারকে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়। এ সময় ঋণদাতা এনজিওসহ সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্যার্তদের কাছ থেকে ঋণের কিস্তি আদায় বন্ধ রাখার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে সরকারি পরিপত্রে তিন মাস কিস্তি আদায় স্থগিতের নির্দেশনা দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
স্থানীয় ওই গণমাধ্যমকর্মী আরও দাবি করেন, বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান এনজিও প্রতিনিধিদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করে সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নের বিষয়ে অবহিত করেছিলেন। এরপরও বন্যাকবলিত এলাকায় নিয়মিত কিস্তি আদায় চলছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে বুধবার সকালে বাঘাইছড়ির মুসলিম ব্লক মাতাব্বর পাড়ায় গিয়ে স্থানীয়দের কাছ থেকে কিস্তি আদায়ের দৃশ্য দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। সেখানে পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশন (পিডিবিএফ)-এর ফিল্ড কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান কিস্তি আদায় করছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়।

এ সময় সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বন্যাকবলিত এলাকায় কিস্তি আদায় বন্ধ রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, তাদের এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন ঋণগ্রহীতা কিস্তি দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলেও কিস্তি আদায় অব্যাহত রাখা হয়।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয়দের ভাষ্য, অনেক পরিবার এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। কারও ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কারও নষ্ট হয়েছে কৃষিজমি ও গবাদিপশু। অনেকের আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেক পরিবারকে দুমুঠো ভাতের ব্যবস্থা করতেও অন্যের সহায়তার দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে।

স্থানীয়রা বলেন, ‘যে পরিবারটি আজ নিজের খাবারের ব্যবস্থা করতে পারছে না, তাদের কাছ থেকে ঋণের কিস্তি আদায়ের জন্য চাপ দেওয়া অত্যন্ত অমানবিক। একদিকে বন্যার ক্ষতি, অন্যদিকে ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারানোর কষ্ট; এর মধ্যে ঋণের কিস্তির চাপ মরার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো।’

তাদের ভাষ্য, বন্যার পানি নেমে গেলেই মানুষের দুর্ভোগ শেষ হয় না। বরং পানি নেমে যাওয়ার পর শুরু হয় ঘর মেরামত, নষ্ট হয়ে যাওয়া কৃষি ও ব্যবসা পুনরায় দাঁড় করানো এবং জীবিকা ফিরে পাওয়ার সংগ্রাম। এই পুনর্বাসনের সময়টিতে ঋণের কিস্তির চাপ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।

একজন ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা বলেন, ‘বন্যায় ঘরের চাল-চুলা, খাবার ও আয়-রোজগার—সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন সংসার চালানোই কঠিন। এই সময়ে কিস্তির টাকা কোথা থেকে দেব? সরকার যদি কিস্তি বন্ধ রাখতে বলে থাকে, তাহলে আমাদের ওপর চাপ দেওয়া কেন?’
আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘বন্যার সময় মানুষকে বাঁচাতে ত্রাণ দিতে হচ্ছে, খাবার দিতে হচ্ছে। সেখানে একই সময়ে কিস্তির জন্য চাপ দেওয়া হলে অসহায় মানুষ আরও ভেঙে পড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে কিছুটা সময় না দিলে তারা ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে না।’

এ পরিস্থিতিতে এমআরএর নির্দেশনা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একটি বিশেষ মনিটরিং সেল গঠনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, কোন কোন এলাকা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কোথায় কিস্তি আদায় স্থগিত থাকার কথা; তা চিহ্নিত করে নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন।

স্থানীয়দের দাবি, জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে উপজেলা প্রশাসন, এমআরএ, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সমন্বয়ে একটি মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হলে সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন সহজ হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের অভিযোগ জানানোর জন্য একটি হটলাইন বা অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থাও চালু করা প্রয়োজন।

পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশন (পিডিবিএফ) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সংবিধিবদ্ধ সরকারি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। ফলে সরকারি নির্দেশনা জারির পরও মাঠপর্যায়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কিস্তি আদায়ের অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এদিকে সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে ক্ষুদ্রঋণের উদ্বৃত্ত তহবিল থেকে ব্যয় করা অর্থের কার্যোত্তর অনুমোদন নিতে হবে। এ জন্য ব্যয়ের এক মাসের মধ্যে স্থানীয় প্রশাসনের প্রত্যয়ন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রমাণকসহ এমআরএর কাছে আবেদন করতে হবে।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন; সরকারি নির্দেশনা যদি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নই না হয়, তাহলে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ কার কাছে যাবে? তাদের মতে, বন্যার্ত মানুষের এখন প্রয়োজন কিছুটা সময়, সহানুভূতি ও পুনর্বাসনের সুযোগ। এই সংকটময় সময়ে কিস্তির চাপ নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়াই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মানবিক দায়িত্ব।