সন্তানের ঘরে ঠাঁই হয়নি, শতবর্ষী বৃদ্ধের পাশে দাঁড়ালেন প্রতিমন্ত্রী টুকু

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ সবচেয়ে বেশি ভরসা খোঁজেন নিজের সন্তান-স্বজনের কাছে। অথচ টাঙ্গাইলের এক শতবর্ষী বৃদ্ধের জীবনে ঘটেছে তার সম্পূর্ণ উল্টো। যে মানুষটি সারাজীবন পরিশ্রম করে সন্তানদের মানুষ করেছেন, বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে, প্রায় দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে শেষ পর্যন্ত তাকেই ফেলে রাখা হলো রাস্তার পাশে। অসহায় সেই বৃদ্ধের কান্না শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় টাঙ্গাইল সদর আসনের সংসদ সদস্য ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর কানে। তার হস্তক্ষেপেই নতুন আশ্রয় ও চিকিৎসার নিশ্চয়তা পান ওই বৃদ্ধ।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সন্ধ্যায় টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বল্লা ইউনিয়নের বইল্লা এলাকার একটি সেতুর পাশে কান্নারত অবস্থায় স্থানীয়দের নজরে আসেন শতবর্ষী মফিজ উদ্দিন। প্রায় দৃষ্টিশক্তিহীন এই বৃদ্ধ দীর্ঘদিন ধরেই বয়সজনিত দুর্বলতায় একা চলাফেরা করতে পারেন না। দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব কাজেই তাকে অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলার এনায়েতপুর গ্রামের বাসিন্দা মফিজ উদ্দিন তিন ছেলে ও তিন মেয়ের জনক। প্রায় আট বছর আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকেই তার জীবনে নেমে আসে নিঃসঙ্গতা। এক ছেলে মারা গেছেন, বড় ছেলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত, আর ছোট ছেলে আলাদা সংসার করেন। জীবনের শেষ সম্বলটুকুও মাত্র ১০০ টাকার বিনিময়ে দুই ছেলের নামে লিখে দেওয়ার পর থেকেই পরিবারে তার অবস্থান ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

জানা যায়, এতদিন তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত বড় ছেলে শামসুলের বাড়িতেই থাকতেন। ছেলের স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সেখানে নাতনি ও তার স্বামী বসবাস শুরু করেন। কিন্তু বৃদ্ধ দাদার দায়িত্ব নিতে তারা অনাগ্রহী ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তারা মফিজ উদ্দিনকে বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে নিয়ে গিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে চলে যান। দীর্ঘ সময় সেখানে বসে অসহায়ের মতো কান্না করতে থাকেন তিনি। পরে স্থানীয়রা এগিয়ে এসে তার পরিচয় শনাক্ত করেন এবং বিষয়টি প্রশাসনকে জানান।

ঘটনার খবর পৌঁছে যায় প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর কাছে। বিষয়টি জানার পর তিনি তাৎক্ষণিকভাবে টাঙ্গাইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মুক্তার আশরাফ উদ্দিনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে বৃদ্ধকে উদ্ধার করে নিরাপদে তার ছোট মেয়ে রিনা বেগমের জিম্মায় পৌঁছে দেয়। একই সঙ্গে ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়। ইতোমধ্যে বৃদ্ধের নাতনিকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে তার স্বামী পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যান।

শুধু উদ্ধার করেই দায়িত্ব শেষ করেননি প্রতিমন্ত্রী। মফিজ উদ্দিনের চিকিৎসা, খাবার, বাসস্থান ও প্রয়োজনীয় সব ব্যয়ভার ব্যক্তিগতভাবে বহনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি দ্রুত বৃদ্ধভাতার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে তার জন্য আলাদা কক্ষ ভাড়া নেওয়া এবং নিয়মিত সেই ব্যয় বহনের আশ্বাসও দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

প্রথমদিকে বাবার দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলেও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার পর ছোট মেয়ে রিনা বেগম বাবার দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে সম্মত হন।

রিনা বেগম বলেন, 'পাশের বাড়ির লোকজনের মাধ্যমে জানতে পারি আমার বাবাকে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছে। বাবাকে ওই অবস্থায় দেখে খুব কষ্ট পেয়েছি। প্রতিমন্ত্রী আমার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এখন থেকে বাবার দায়িত্ব আমিই পালন করব।'

টাঙ্গাইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম মুক্তার আশরাফ উদ্দিন বলেন, 'প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশ পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বৃদ্ধকে উদ্ধার করে। তিনি বর্তমানে তার ছোট মেয়ের হেফাজতে রয়েছেন। নাতনিকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে তার স্বামী পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যান।'

এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, 'একজন অসহায় বৃদ্ধকে এভাবে রাস্তায় ফেলে রেখে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত অমানবিক ও হৃদয়বিদারক। বাবা-মা আমাদের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। তাদের অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। যতদিন প্রয়োজন, এই বৃদ্ধের চিকিৎসা, থাকা-খাওয়া ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার দায়িত্ব আমি নেব। একই সঙ্গে যারা তাকে এভাবে পরিত্যাগ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সমাজের প্রতিটি মানুষকে অসহায় প্রবীণদের পাশে দাঁড়াতে হবে।'

ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের দায়িত্বহীনতার নয়, বরং সমাজে প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। শেষ বয়সে একজন বাবার প্রাপ্য ছিল সন্তানের স্নেহ-ভালোবাসা। কিন্তু তার ভাগ্যে জুটেছিল রাস্তার পাশের নির্জনতা। সেই অন্ধকার মুহূর্তে অন্তত একজন মানুষের মানবিক উদ্যোগ তাকে নতুন করে বেঁচে থাকার আশা দেখিয়েছে।