অন্ধকার গোয়ালঘরেই সোহেলের সংসার, পাশে দাঁড়ালেন ইউএনও

নিজের নামে এক শতাংশ জমিও নেই। নেই বসতভিটা কিংবা থাকার মতো স্থায়ী কোনো ঘর। অন্যের গরু রাখার জন্য তৈরি ছোট্ট একটি গোয়ালঘরসদৃশ কক্ষেই স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে দিন কাটছে ফরিদপুরের সালথা উপজেলার আটঘর গ্রামের সোহেলের।

শারীরিক অসুস্থতায় নিজেও নিয়মিত কাজ করতে পারেন না, আর তাঁর স্ত্রী দুই কিডনি নষ্ট হয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। এমন অসহায় অবস্থার খবর পেয়ে পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছেন সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন। প্রশাসনের উদ্যোগে তাঁদের জন্য ঘর নির্মাণ ও জীবিকার ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

শুক্রবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে আটঘর গ্রামে সোহেলের সেই ঘরে গিয়ে দেখা যায়, অল্প জায়গার মধ্যেই গাদাগাদি করে রাখা সংসারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী। ঘরের এক অংশে কোনো রকমে পরিবারের সদস্যদের থাকার ব্যবস্থা। স্বাভাবিক বসবাসের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না থাকলেও অভাবের কারণে এই ঘরেই দিন-রাত কাটছে তাঁদের।

সোহেলের শারীরিক অবস্থাও ভালো নয়। অসুস্থতার কারণে নিয়মিত কাজ করতে পারেন না। ফলে পরিবারের স্থায়ী কোনো আয় নেই। তাঁর স্ত্রীও দুই কিডনি নষ্ট হয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। একসময় ভিক্ষা করে সংসারে সামান্য সহযোগিতা করলেও অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ায় এখন সেটিও সম্ভব হয় না।

একদিকে চিকিৎসার খরচ, অন্যদিকে প্রতিদিনের খাবারের ব্যবস্থা দুইয়ের মধ্যে প্রতিনিয়ত টানাপোড়েন চলছে পরিবারটিতে। আয় না থাকায় কখনো খাবার জোটে, আবার কখনো অভাবের কারণে চুলা জ্বলে না।

অভাবের প্রভাব পড়েছে সন্তানদের জীবনেও। ১৩ বছর বয়সী বড় ছেলে পড়াশোনা ছেড়ে এখন একটি দোকানে কাজ করে। যে বয়সে তার স্কুলে যাওয়ার কথা, সহপাঠীদের সঙ্গে পড়াশোনা ও খেলাধুলায় সময় কাটানোর কথা, সেই বয়সেই পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে উপার্জনের চেষ্টা করছে সে।

সাত বছরের ছোট ছেলে এখনো প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। বড় ভাইয়ের মতো তাকেও যেন অভাবের কারণে পড়াশোনা ছাড়তে না হয় এটাই পরিবারের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তার পড়াশোনা কতদিন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি রাজিয়া বেগম বলেন, পরিবারটির অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। সোহেলের নিজের কোনো জায়গা-জমি নেই। তাঁদের জন্য সবার আগে একটি স্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা দরকার। পাশাপাশি অসুস্থ সোহেল ও তাঁর স্ত্রীর চিকিৎসার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল মাতুব্বর বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই তাঁরা পরিবারটির এমন দুরবস্থা দেখে আসছেন। অসুস্থতার কারণে সোহেল কাজ করতে পারেন না, তাঁর স্ত্রীও গুরুতর অসুস্থ। ফলে সংসার চালানো তাঁদের জন্য খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, শুধু একটি ঘর নয়, পরিবারটির স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য আয়ের একটি ব্যবস্থাও দরকার। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ ও প্রশাসন পাশে দাঁড়ালে পরিবারটি ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতে পারে।

সোহেলের পরিবারের মানবেতর জীবনযাপনের খবর পেয়ে শুক্রবার বিকেলে তাঁদের বাড়িতে যান সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দবির উদ্দিন। তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন, ঘরের ভেতরের পরিবেশ দেখেন এবং তাঁদের জীবনযাপনের বাস্তব চিত্র সম্পর্কে খোঁজ নেন।

পরিবারটির অবস্থা দেখে ইউএনও দবির উদ্দিন বলেন, সোহেলের পরিবারের অবস্থা অত্যন্ত মানবেতর। তাঁদের মাথা গোঁজার মতো কোনো ঘর নেই। একই সঙ্গে পরিবারের আয়েরও কোনো ব্যবস্থা নেই।

তিনি জানান, সালথা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সোহেলের পরিবারের জন্য একটি ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ঘর তৈরির কাজ শুরু হবে। পাশাপাশি তাঁদের জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি দোকানের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।

ইউএনওর এই উদ্যোগে নতুন আশার আলো দেখছে পরিবারটি। দীর্ঘদিন ধরে যে ঘরটি ছিল তাঁদের কাছে অধরা স্বপ্ন, প্রশাসনের উদ্যোগে সেটিই এখন বাস্তব হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সোহেলের পরিবারের গল্পটি শুধু একটি অসহায় পরিবারের গল্প নয়; গ্রামবাংলার এমন বহু পরিবারের প্রতিচ্ছবি, যাদের কাছে নিরাপদ একটি ঘর, চিকিৎসার সুযোগ কিংবা নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা এখনো কঠিন বাস্তবতা। একটি ঘর ও ছোট একটি দোকান হয়তো রাতারাতি তাঁদের জীবন বদলে দেবে না, তবে সেটিই হতে পারে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রথম সিঁড়ি।

গোয়ালঘরসদৃশ ছোট্ট ঘরটির অন্ধকারে এখন তাই নতুন অপেক্ষা কবে তৈরি হবে কাঙ্ক্ষিত ঘর, কবে একটু নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবে পরিবারটি, আর কবে সাত বছরের শিশুটির ভবিষ্যৎ দারিদ্র্যের কাছে হার না মেনে নিজের মতো করে এগিয়ে যাবে।