করোনার সেই দিনগুলোর কথা মনে হলে এখনো টিটু মিয়ার চোখে ভেসে ওঠে অনিশ্চয়তার ছবি। কাজ নেই, আয় নেই। সংসার চালানোর মতো টাকাও নেই। হাতে ছিল মাত্র ৫০০ টাকা। সেই টাকাটুকু নিয়েই একদিন জামালপুর শহরের পাঁচ রাস্তার একটি মার্কেটের সামনে বসেছিলেন চা নিয়ে। সেদিন হয়তো তিনি নিজেও ভাবেননি, ওই ৫০০ টাকার চা একদিন তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে।
এখন প্রতিদিন তার দোকানে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার চা বিক্রি হয়। মাসে বিক্রি প্রায় তিন লাখ টাকা। চা বিক্রির আয় দিয়ে ছয় বছরে প্রায় এক কোটি টাকা খরচ করে পাকা বাড়ি করেছেন। সংসারে ফিরেছে স্বচ্ছলতা। তার দোকানে কাজ করেন আরও কয়েকজন।
জামালপুর শহরের সরদারপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. টিটু মিয়া। প্রায় ১৫ বছর সিএনজি চালিয়েছেন। জেলা শহরের বিভিন্ন সড়কে গাড়ি চালিয়ে যা আয় হতো, তা দিয়েই চলত সংসার। কিন্তু সেই জীবনে ছিল নানা বিড়ম্বনা। একপর্যায়ে সিএনজি চালানো ছেড়ে দেন তিনি।
মহামারি করোনার সময়ে চারদিকে তখন থমথমে পরিস্থিতি ছিল। মানুষের চলাচল কমে যায়, বন্ধ হয়ে যায় অনেকের কাজ। টিটু মিয়াও হয়ে পড়েন কর্মহীন। একসময় তার হাতে ছিল মাত্র ৫০০ টাকা। পরে সেই ৫০০ টাকা দিয়েই শহরের পাঁচ রাস্তার পাশে ছোট করে শুরু করেন চা বিক্রি। শুরুতে ক্রেতা কম ছিল। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চায়ের স্বাদ ও ব্যবহারের কারণে বাড়তে থাকে পরিচিতি। একসময় ছোট সেই দোকানে ভিড় জমতে শুরু করে।
টিটু মিয়ার দোকানে তিন ধরনের চা রয়েছে। আদা চা ৫ টাকা, লেবু চা ১০ টাকা। আর তেঁতুল, মরিচ ও লেবু মিশিয়ে তৈরি বিশেষ চায়ের দাম ২০ টাকা। এ ছাড়া লেবুর শরবত ২০ টাকা। প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১২০ কেজি লেবু লাগে। প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দোকানে সবচেয়ে বেশি চা বিক্রি হয়।
টিটু মিয়া বলেন, ‘আগে আমি ১৫ বছর সিএনজি চালিয়েছি। অনেক কষ্ট ছিল। করোনার সময় একেবারে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলাম। হাতে মাত্র ৫০০ টাকা ছিল। তখন মনে হলো, বসে থাকলে তো চলবে না। কিছু একটা করতেই হবে। পরে চা বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ধীরে ধীরে মানুষ আমার চা পছন্দ করতে শুরু করল। এখন আল্লাহর রহমতে ভালো আছি। চা বিক্রির এই আয়েই গত ছয় বছরে প্রায় এক কোটি টাকা খরচ করে বাড়ি করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। ছেলে মাদ্রাসায় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। মেয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। তাদের পড়াশোনা করাতে চাই। তাদের ভবিষ্যৎটাও যেন আমার মতো সংগ্রামে না কাটে এটাই আমার স্বপ্ন।’
টিটু মিয়ার দোকানে কাজে সহযোগিতা করেন আতাউর রহমান নামে এক তরুণ। তিনি বলেন, ‘আমি একটি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা করি। পড়াশোনার পাশাপাশি চায়ের দোকানে কাজ করি। বিকেলের দিকে দোকানে আসি, রাত ৯টার দিকে চলে যাই। এখান থেকে যে টাকা পাই, তা দিয়ে নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি বাড়িতেও কিছু টাকা দিতে পারছি।’
টিটু মিয়ার দোকানে নিয়মিত চা খেতে আসেন স্কুলশিক্ষক আল আমিন। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনই সন্ধ্যার পর এখানে চা খেতে আসি। সন্ধ্যার পর অনেক মানুষই এ দোকানে চা ও শরবত খেতে আসেন। টিটু মিয়া ক্রেতাদের সঙ্গে সব সময় ভালো আচরণ করেন। মানুষ হিসেবেও তিনি খুব ভালো। তাঁর ভালো ব্যবহার ও সুস্বাদু চায়ের কারণেই দোকানটিতে ক্রেতাদের ভিড় বেশি থাকে।’