সকালে ছিল স্কুলের পরীক্ষা। তাই অন্য দিনের তুলনায় একটু আগেই ছেলেকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন বাবা। পরিকল্পনা ছিল ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে নিজেও কর্মস্থলে যাবেন। কিন্তু সেই যাত্রাপথই হয়ে উঠল জীবনের শেষ পথ। কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল। সাতক্ষীরার তালা উপজেলার শাহাপুর বাজারে দ্রুতগতির একটি বাসের চাপায় প্রাণ হারাল সপ্তম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র কুশল সরদার (১৩)। আহত হয়েছেন তার বাবা, শিক্ষক কানাই লাল সরদার।
বুধবার ( ১ জুলাই ) সকালে এ হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনাটি ঘটে। কুশল তালা ব্রজেন দে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছিল। সে নলতা গ্রামের বাসিন্দা এবং রথখোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কানাই লাল সরদারের বড় ছেলে।
সকালে মোটরসাইকেলে করে বাবা ছেলেকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছিলেন। শাহাপুর বাজার এলাকায় পৌঁছালে পেছন থেকে আসা একটি দ্রুতগামী বাস তাদের চাপা দেয়। এতে কুশল বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায়। গুরুতর আহত হন তার বাবা।
তালা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) তৌহিদুল ইসলাম জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বাসটিকেও জব্দ করেছে তালা থানা পুলিশ। এছাড়া দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট খলিলনগর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জিয়াউর রহমান জানান, কানাই লাল সরদার এলাকায় একজন সজ্জন ও সম্মানিত শিক্ষক হিসেবে পরিচিত। তার স্ত্রী মৌমিতা সরদারও একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। দুই সন্তানের মধ্যে কুশল ছিল বড়। পড়ালেখায় মেধাবী ও ভদ্র স্বভাবের এই শিক্ষার্থীকে ঘিরে বাবা-মায়ের ছিল অনেক স্বপ্ন।
তিনি আরও জানান, বুধবার কুশলের স্কুলে পরীক্ষা ছিল। তাই নির্ধারিত সময়ে তাকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে নিজ কর্মস্থলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন বাবা। কিন্তু পথেই ঘটে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। মুহূর্তের মধ্যে সন্তানকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন কানাই লাল সরদার। আহত অবস্থাতেও তার সন্তানের জন্য আহাজারি উপস্থিত মানুষকে আবেগাপ্লুত করে তোলে।
কুশলের অকাল মৃত্যুতে নেমে এসেছে পরিবারে গভীর শোকের ছায়া। আত্মীয়-স্বজন, সহপাঠী, শিক্ষক এবং এলাকাবাসীর চোখে ছিল অশ্রু। যে শিশু সকালে পরীক্ষা দিতে বের হয়েছিল, সে আর কোনো দিন স্কুলের বেঞ্চে ফিরবে না এই নির্মম বাস্তবতা মেনে নিতে পারছেন না কেউই।
আহত অবস্থায় কানাই লাল সরদার বারবার ছেলের নাম ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সন্তানের নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে তিনি বিলাপ করতে থাকেন যে ছেলেকে পরীক্ষা দিতে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছিলেন, মুহূর্তের মধ্যেই তাকে হারাতে হবে, তা কোনোদিন কল্পনাও করেননি। তার সেই হৃদয়বিদারক আহাজারিতে উপস্থিত মানুষও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি; পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহত কানাই লাল সরদারকে উদ্ধার করে তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।