ফেলে দেওয়া মাছের আঁইশ থেকে নতুন সম্ভাবনা

একসময় মাছ কাটার পর আঁইশসহ উচ্ছিষ্ট অংশ ফেলে দেওয়া হতো আবর্জনা হিসেবে। এখন সেই ফেলে দেওয়া আঁইশই হয়ে উঠেছে বাড়তি আয়ের উৎস। চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন বাজারে মাছ কাটার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা আঁইশ সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে এসব আঁইশ যাচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে; সেখান থেকে প্রক্রিয়াজাত হয়ে রপ্তানি হচ্ছে জাপান, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে। এতে তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান, পাশাপাশি আসছে বৈদেশিক মুদ্রা।

চুয়াডাঙ্গা জেলা মৎস্য অফিস ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলার বিভিন্ন বাজারে মাছ কাটার সময় প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আঁইশ সংগ্রহ হচ্ছে। আগে এসব আঁইশ ফেলে দেওয়া হলেও এখন মাছ কাটার সঙ্গে জড়িত অনেকেই তা যত্ন করে জমিয়ে রাখছেন। পরে পরিষ্কার করে রোদে শুকিয়ে বিক্রি করছেন স্থানীয় ব্যাপারীদের কাছে।

চুয়াডাঙ্গা শহরের বড় বাজার ঘুরে দেখা যায়, মাছ কাটার পর আঁইশ আলাদা করে রাখা হচ্ছে। বাজারের বিভিন্ন মাছ কাটার দোকানে বস্তা কিংবা পাত্রে জমিয়ে রাখা হচ্ছে এসব আঁইশ। কয়েক দিন পরপর ব্যবসায়ীরা তা সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছেন। শুকনো আঁইশের মান ও পরিমাণ অনুযায়ী দাম নির্ধারণ হয়। বর্তমানে প্রতি মণ আঁইশ ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, দেশের মৎস্য খাত থেকে বিপুল পরিমাণ আঁইশ উৎপন্ন হলেও এর বড় অংশ এখনো পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না। মাছের এই উপজাতকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে সংগ্রহব্যবস্থা, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারসংযোগ গড়ে তোলা গেলে এর অর্থনৈতিক মূল্য আরও বাড়ানো সম্ভব। চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে মাছের আঁইশের চাহিদা থাকায় এ খাতকে রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। চুয়াডাঙ্গায় ইতোমধ্যে মাছ কাটার সঙ্গে যুক্ত মানুষের বাড়তি আয়ের যে পথ তৈরি হয়েছে, তা বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দিতে পারলে একসময়ের ফেলে দেওয়া এই উচ্ছিষ্টই হয়ে উঠতে পারে নতুন কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি সম্ভাবনাময় উৎস।

চুয়াডাঙ্গা জিনতলা পাড়ার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে বড় বাজারে মাছ কাটেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ কেজি আঁইশ সংগ্রহ হয়। এসব আঁইশ বিক্রি করে মাসে অতিরিক্ত ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা আয় করেন তিনি।

সাইফুল বলেন, ‘আগে মাছের আঁইশ ফেলে দিতাম। এখন বুঝেছি, এটাও বিক্রি করে আয় করা যায়। তাই আঁইশগুলো আলাদা করে জমিয়ে রাখি।’

বড় বাজারের আরেক মাছ কাটার ব্যবসায়ী শরীফ উদ্দীন জানান, তিনি প্রতিদিন প্রায় এক মণ মাছ কাটেন। মাছ কাটার পারিশ্রমিকের পাশাপাশি আঁইশ বিক্রি করেও বাড়তি অর্থ আসে। বিদেশে আঁইশের চাহিদা থাকায় বর্তমানে এর ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা বাসস্ট্যান্ড বাজারে প্রায় দেড় বছর ধরে মাছ কাটছেন শুকুর আলী। তিনি বলেন,, শুরুতে মাছের আঁইশ অন্য সবার মতো তিনিও ফেলে দিতেন। পরে জানতে পারেন, এসব আঁইশ সংগ্রহ করে বিদেশে রপ্তানি করা হয়। এরপর থেকেই আঁইশ জমিয়ে বিক্রি করছেন।

শুকুর আলী বলেন, মাছের আঁইশ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের বিষয়ে তিনি ওয়েভ ফাউন্ডেশন থেকে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কিছু সরঞ্জাম ও আর্থিক সহায়তাও পেয়েছেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জানা গেছে, বিভিন্ন বাজার থেকে সংগ্রহ করা আঁইশ প্রথমে পরিষ্কার করে শুকানো হয়। এরপর তা বস্তাবন্দি করে ঢাকাসহ দেশের বড় বাজারগুলোতে পাঠানো হয়। সেখানে আরও প্রক্রিয়াজাত করার পর রপ্তানিকারকদের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাছের আঁইশ থেকে কোলাজেন, জেলাটিনসহ নানা উপাদান তৈরি করা হয়। এসব উপাদান ব্যবহার করা হয় প্রসাধনী, ওষুধ ও অন্যান্য শিল্পপণ্যে। ফলে মাছের আঁইশের আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা তৈরি হয়েছে।

ওয়েভ ফাউন্ডেশনের মৎস্য কর্মকর্তা সাঈদ-উর-রহমান বলেন, চুয়াডাঙ্গা সদর ও দামুড়হুদা উপজেলার ছয়জনকে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় মাছ কাটার পর আঁইশ সংগ্রহে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, একসময় বর্জ্য হিসেবে বিবেচিত মাছের আঁইশ এখন সম্ভাবনাময় রপ্তানি পণ্যে পরিণত হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে এই খাতকে এগিয়ে নেওয়া গেলে একদিকে মাছের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে, অন্যদিকে নতুন উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান তৈরি হবে। বাজারসংযোগ, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারলে আঁইশভিত্তিক শিল্প দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফরহাদুর রেজা বলেন, মাছের আঁইশ বিদেশে রপ্তানি হওয়ার কারণে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এর সঙ্গে যুক্ত মানুষের জন্য সৃষ্টি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ।

তিনি বলেন, ‘একসময় মাছের আঁইশ ছিল আবর্জনা, এখন সেটিই সম্পদে পরিণত হয়েছে। আঁইশ থেকে জেলাটিন উৎপাদন করা যায়, যা ওষুধ ও প্রসাধনী শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে এ ধরনের প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা না থাকায় আঁইশ মূলত বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। এ খাতে সম্ভাবনা অনেক।’

ফরহাদুর রেজা আরও বলেন, মাছের আঁইশ কোলাজেনসমৃদ্ধ হওয়ায় আধুনিক শিল্পে এর ব্যবহার বাড়ছে। প্রসাধনী, ত্বকের যত্ন ও অ্যান্টি-এজিং পণ্য, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং জেলাটিন উৎপাদনে মাছের আঁইশ থেকে পাওয়া উপাদান ব্যবহার করা হয়। বিশ্ববাজারে মাছের আঁইশ থেকে উৎপাদিত কোলাজেনের চাহিদা বাড়ায় বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের জন্যও নতুন রপ্তানি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

মাছ কাটার পর আঁইশ সংগ্রহের পর তা আকার ও গুণগত মান অনুযায়ী বাছাই করা হয়। এরপর পরিষ্কার পানিতে একাধিকবার ধুয়ে রোদে শুকানো হয়। পর্যাপ্তভাবে শুকিয়ে আর্দ্রতা কমিয়ে আনা হলে তা সংরক্ষণ ও পরিবহনের উপযোগী হয়। স্থানীয় পর্যায়ে এই প্রক্রিয়াই অনুসরণ করে আঁইশ ব্যাপারীদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে।