জনবল সংকটে মুখ থুবড়ে পড়েছে পেড়লির ১০ শয্যার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র

অবহেলিত এলাকার মা ও শিশুদের আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল চিকিৎসাকেন্দ্র। তবে উদ্বোধনের ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় নড়াইলের কালিয়া উপজেলার পেড়লি ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি কার্যত অচল হয়ে আছে। আধুনিক ভবন, ওয়ার্ড ও চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না স্থানীয়রা।

ফলে গ্রামীণ এলাকার দরিদ্র গর্ভবতী নারী ও শিশুরা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে প্রসবকালীন জটিলতায় তাদের নড়াইল সদর কিংবা খুলনায় যেতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন রোগীদের দুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হচ্ছে সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামো ও চিকিৎসা সরঞ্জাম।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কালিয়া উপজেলার খড়রিয়া বাজারের পাশে ৫০ শতক জমির ওপর মনোরম পরিবেশে নির্মাণ করা হয়েছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি। ২০২০ সালে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। সরকারের ৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা ব্যয়ে সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে দুটি তিনতলা ভবন। এর একটি মূল হাসপাতাল ভবন এবং অন্যটি চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক কোয়ার্টার।

গ্রামীণ এলাকার মা ও শিশুদের ভর্তি রেখে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য এখানে পাঁচ শয্যার দুটি অত্যাধুনিক ওয়ার্ডসহ মোট ১০টি শয্যার ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ১০টি পৃথক কেবিন। জটিল ও জরুরি প্রসবকালীন সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে একটি আধুনিক অস্ত্রোপচার কক্ষও (ওটি) প্রস্তুত করা হয়েছিল।

জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু রাখতে সরকারিভাবে ১০টি পদ অনুমোদিত রয়েছে। এর মধ্যে দুজন চিকিৎসা কর্মকর্তা, একজন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব), একজন ফার্মাসিস্ট, চারজন পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা (এফডব্লিউভি), একজন অফিস সহকারী ও একজন অফিস সহায়ক থাকার কথা।

কিন্তু অনুমোদিত ১০টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র একজন ফার্মাসিস্ট। তিনিও একসঙ্গে আরও তিনটি স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে চিকিৎসক, নার্সসহ প্রয়োজনীয় কোনো সেবাদাতা না থাকায় কেন্দ্রটির নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অব্যবহৃত পড়ে থাকায় কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি ওটি ও ওয়ার্ডগুলোতেও ধুলোবালি জমছে।

কেন্দ্রটির ফার্মাসিস্ট শাহরিয়ার মোল্যা বলেন, তিনি এখানে ফার্মাসিস্ট পদে নিয়োগ পেলেও আরও তিনটি স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন। এ কারণে সপ্তাহে মাত্র দুই দিন এখানে আসতে পারেন। তার ভাষ্য, সেবাকেন্দ্রটিতে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা অনেক বেশি হলেও সে তুলনায় সেবাদাতা খুবই কম। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় নিয়মিত হাসপাতালটি খোলা সম্ভব হচ্ছে না।

খড়রিয়া বাজার ও পেড়লি এলাকার বাসিন্দারা জানান, হাসপাতালটি নির্মাণের পর তারা ভেবেছিলেন, সামান্য চিকিৎসার জন্য আর নড়াইল সদর কিংবা খুলনায় যেতে হবে না। কিন্তু চিকিৎসক-নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় তাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।

তাদের অভিযোগ, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাসপাতালটি ব্যবহার না হওয়ায় সরকারি সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের প্রসবকালীন সেবার জন্য এখনো ঝুঁকি নিয়ে দূরের শহরে যেতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থের পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে এবং সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে দ্রুত এই মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকা অস্ত্রোপচার কক্ষ (ওটি) ও অন্যান্য চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।

জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক আলিফ নূর বলেন, নড়াইলে জনবল সংকট রয়েছে। অনুমোদিত জনবলের তিন ভাগের দুই ভাগ পদই এখানে শূন্য। মন্ত্রণালয় সারা দেশে শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নিয়েছে। আশা করছি, অচিরেই এসব শূন্য পদ পূরণ হবে। জনবল নিয়োগ হলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।